ট্যাংকে ইউক্রেনের পতাকা যুক্ত করতে ছবিটি এডিট করা হয়েছে

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

ফেসবুকে একটি ছবি বিভিন্ন পোস্টে শত শতবার শেয়ার হয়েছে যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে, ছবিতে দেখা যাচ্ছে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া ইরাক যুদ্ধের সময় দেশটিতে ইউক্রেনিয়ান ট্যাংক এবং সেনারা অবস্থান করছেন। ছবিটি ইউক্রেনের দ্বিচারিতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে পোস্টগুলোতে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে রাশিয়ার হামলার নিন্দা করলেও এই ইউক্রেনই ২০০৩ সালে ইরাকে সৈন্য ও সমরাস্ত্র পাঠিয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছবিটিতে যাদেরকে দেখা যাচ্ছে তারা ইউক্রেনিয়ান সেনা নন, এবং ট্যাংকটিও ইউক্রেনের নয়। বরং এডিট করে ট্যাংকের গায়ে ইউক্রেনের পতাকা যুক্ত করা হয়েছে। ইউক্রেনিয়ান সেনারা ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেও ছবিতে মূলত ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক-কুয়েত সীমান্তে মার্কিন সেনাবহরকে দেখা যাচ্ছে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে এখানে ৭৫ হাজারের বেশি ফলোয়ার সমৃদ্ধ একটি পেইজে ছবিটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়েছে: "ছবিতে ইউক্রেনের ট্যাংক ইরাকে হামলায়।"

পোস্টে আরও বলা হয়: "নিরপরাধ ইউক্রেনের জনগণের জন্য সমবেদনা জানিয়েও এ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, ইউরোপীয়রা, তোমরা এবার একটু দেখ, নিজেদের রক্তের রঙ কেমন। কেমন লাগে মজলুম শিশু-বৃদ্ধের আর্তনাদ। কেমন লাগে জীবন ও জনপদ নির্মূলের মর্মযাতনা।"

আরও বলা লেখা হয়েছে: "মিথ্যা আযুহাত দিয়ে ইরাকে হামলা চালাতে আমেরিকার সংগী হয়ে এসেছিল, হত্যা করেছিল সাধারণ মানুষকে, আজকে তাদেরকে মারতে রাশিয়া হাজির।"

ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, ইরাকের উৎখাত হওয়া একনায়ক সাদ্দাম হোসেনের একটি ম্যুরালের পাশে একটি ট্যাংক দাঁড়িয়ে রয়েছে যার পেছনের অংশে ইউক্রেনের পতাকা এবং ইউক্রেনিয়ান সেনাবাহিনীর প্রতীক খচিত রয়েছে। এবং পাশে কয়েকজন সেনা অবস্থান করছেন।

ছবিটি ফেসবুকে এখানে, এখানে এখানে একইরকম দাবি সহকারে প্রকাশিত হয়েছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৫ লাখের বেশি মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন এবং সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের জন্য এটি সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট।

তবে ইরাক যুদ্ধে ২০০৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইউক্রেনের সৈন্যরা অংশ নিলেও ভাইরাল হওয়া ছবিটি এডিট করা।

কীওয়ার্ড ও রিভার্স ইমেজ সার্চ করে মূল ছবিটি ইরাকের কুয়েত আক্রমণ বিষয়ক ২০১১ সালের ২ আগস্ট প্রকাশিত এই নিবন্ধে এখানে পাওয়া গেছে।

আরবি ভাষায় আল বাওয়াবা নামক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই নিবন্ধটিতে ছবির যে ভার্সন ব্যবহার করা হয়েছে তাতে ইউক্রেনের পতাকা ও সেনাবাহিনীর প্রতীকের ছবি নেই। ক্যাপশনে বলা হয়েছে ছবিটি কুয়েতে তোলা।

নীচে বিভ্রান্তিকর ফেসবুক পোস্টে ব্যবহৃত ছবি (বামে) এবং আল বাওয়াবার নিবন্ধে ব্যবহৃত ছবির (ডানে) তুলনামূলক স্ক্রিনশট দেয়া হল:

ভাইরাল হওয়া ছবির ম্যুরালটির সামনে একই রকম সামরিক বহরের ছবি অনলাইনে পাওয়া গেছে যেগুলো ২০০৩ সালে আমেরিকা কর্তৃক ইরাক হামলার এক যুগেরও বেশি আগে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় তোলা।

কীওয়ার্ড সার্চ করে ছবি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গেটি ইমেজেজ-এর ওয়েবসাইটে ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি এবং ১ মার্চ তোলা ছবি পাওয়া গেছে।

এসব ছবির ক্যাপশনে বলা হয়েছে ছবিগুলোতে ইরাক-কুয়েত সীমান্তে সাদ্দাম হোসেনের ম্যুরালের সামনে আমেরিকান সৈন্যদের দেখা যাচ্ছে।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাল-এর সম্পাদক এ আর এম শহীদুল ইসলাম এএফপি'কে জানিয়েছেন ভাইরাল হওয়া ছবিতে যে ট্যাংক দেখা যাচ্ছে সেটি হল "এম১এ১ আব্রামস" যুদ্ধ ট্যাংক যা উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছিল।

ইউক্রেন সংঘাত নিয়ে ছড়ানো বহু ভুয়া তথ্য এএফপি খণ্ডন করেছে যা এখানে দেখতে পাবেন।

ইউক্রেন সংঘাত