বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষায় ইরানিদের জমায়েতের প্রকৃত ফুটেজের দাবিতে ছড়াচ্ছে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও

৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষার জন্য ইরানি জনগণের সমবেত হওয়ার দাবিতে অনলাইনে একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। আদতে ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চারপাশে লোকজন মানববন্ধন করেছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলেও, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি বলে এএফপিকে জানিয়েছে এর নির্মাতা। ইতিপূর্বে জানুয়ারি মাসে এটিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ভিডিও হিসেবে অসত্য পোস্টে ছড়ানো হয়। 

ফেসবুকে ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ছড়ানো একটি পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “শ্বাসরুদ্ধকর এক দৃশ্য—ইরানের মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়, জড়ো হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে। লক্ষ্য একটাই—দেশের জ্বালানি অবকাঠামোকে রক্ষা করা এবং সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।”

পোস্টে ৪৬-সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে বিশাল এক জনসমাবেশকে ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে একটি রাস্তায় মিছিল নিয়ে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। 

Image
এএফপির যোগ করা ক্রস চিহ্ন ও এআই প্রতীকসহ ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য পোস্টের স্ক্রিনশট

দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেয়ার হুমকি দেয় ট্রাম্প। ট্রাম্পের হুমকির পর ইরানের লোকজন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহরে শহরে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে একটি মানববন্ধন করেছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম(আর্কাইভ লিংক)। ওই সংবাদ প্রকাশের পর অনুরূপ দাবিতে ফুটেজটি ফেসবুকে ছড়ানো হয়।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার শর্তে ট্রাম্প দুই সপ্তাহের জন্য ইরানে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে সম্মত হন(আর্কাইভ লিংক)। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান প্রণালিটি অবরুন্ধ করেছে।  

তবে যুদ্ধের অবসান চেয়ে আয়োজিত ১২ এপ্রিলের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর তেহরান ওয়াশিংটনের শর্তাবলি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে(আর্কাইভ লিংক)। 

এরপরই ট্রাম্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন নৌ-অবরোধের নির্দেশ দেন। এই হুঁশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করেন বলেন, কোনো দীর্ঘস্থায়ী চুক্তি সম্পাদিত না হলে, তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবেন। 

তবে অনলাইনে ছড়ানো ভিডিওটি আদতে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।

ব্যাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের জেরে জানুয়ারি মাসে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ওই বিক্ষোভের প্রকৃত ফুটেজ হিসেবে ভিডিওটি অনলাইনে ছড়ানো হলে এএফপি দাবিটি খণ্ডন করে (আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)। 

ছড়ানো ভিডিওটির নিবিড় পর্যবেক্ষণে এমন কিছু দৃশ্যগত ত্রুটি পাওয়া যায়, যা ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। 

মাদ্রিদের পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং প্রতিষ্ঠানটির ‘ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও ডিপ লার্নিং’ গ্রুপের সদস্য হাভিয়ের হুয়ের্তাস-তাতো গত ১২ জানুয়ারি একটি ইমেলে এই অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেন (আর্কাইভ লিংক)। 

উদাহরণ স্বরূপ, ছায়া ও হাতগুলো হঠাৎ করে চলে আসে এবং জানালায় প্রতিফলিত আলো অস্পষ্টভাবে চিত্রিত হওয়া।

ভেরিফিকেশন টুল ইনভিড উইভেরিফাই ব্যবহার করে ক্লিপটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। 

Image
ইনভিড-উইভেরিফাই টুলের ফলাফলের স্ক্রিনশট

ছড়ানো ভিডিওর কিছু সংস্করণে @এলনাজ৫৫৫-নামে একজন ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী ওয়াটারমার্ক পাওয়া যায়। ওয়াটারমার্কটি এলনাজ মানসুরি নামের একজন শিল্পীর, যিনি  তাঁর কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করেন(আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)।

মানসুরি ১৩ জানুয়ারি এএফপি-কে জানান যে, তিনি এআই ব্যবহার করে ভিডিওটি তৈরি করেছেন।

ইরানে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউটের সিদ্ধান্তকে একটি বাস্তব ‘রূপ’ দেয়ার চেষ্টা হিসেবে ইনস্টাগ্রামএক্সে প্রকাশিত ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে বলে জানান এলনাজ(আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)। 

Image
এএফপি-এর যুক্ত করা 'এআই' লেবেলসহ ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নেয়া মানসুরির মূল ইনস্টাগ্রাম পোস্টের স্ক্রিনশট

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সম্পর্কিত অপতথ্য নিয়ে এএফপির আরও প্রতিবেদন পাওয়া যাবে এখানে।   

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ