মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষের ভিডিওটি ২০১১ সালের, ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত নয়

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জের ধরে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে সেটিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষ হস্তান্তরের দৃশ্য বলে দাবি করা হয়। তবে দাবিটি অসত্য; ভিডিওটি ২০১১ সালে ইরাকে নিহত আমেরিকান সৈন্যদের সম্মানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের।

ফেসবুকে ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে ছড়ানো একটি পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর এই প্রথম মার্কিন সৈন্যরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে কফিনে বন্দি হয়ে ফিরতে শুরু করেছে।” 

ভিডিওতে সৈন্যদেরকে একটি সামরিক বিমান থেকে আমেরিকার পতাকায় মোড়ানো কফিন বের করতে দেখা যায়।  

Image
এএফপির যোগ করা ক্রস চিহ্নসহ ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য পোস্টের স্ক্রিনশট

একই ফুটেজ অনুরূপ দাবিতে বাংলা এবং ইন্দোনেশীয় ভাষায় ফেসবুকে ছড়ানো হয়। 

১ মার্চ ২০২৬ তারিখে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের তিনজন সেনা সদস্য নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছে। এরপর থেকে সামাজিক মাধ্যমে দাবিটি ছড়াতে শুরু করে(আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)। 

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন(আর্কাইভ লিংক)। 

জবাবে ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়(আর্কাইভ লিংক)।

ইরানের হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়(আর্কাইভ লিংক)। ইরান তাঁদের বিরুদ্ধে প্রথম হামলাকে আগ্রাসনমূলক আচরণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সরাসরি জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করে।

৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে এক্স-এ প্রকাশিত একটি আপডেটে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানের হামলায় আরও তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে(আর্কাইভ লিংক)।

সেন্টকম আরও জানায়, ইরানের প্রাথমিক হামলার সময় আক্রান্ত একটি স্থাপনা থেকে পূর্বে নিখোঁজ থাকা দুই সেনার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিকটাত্মীয়দের অবহিত না করা পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে। 

তবে মার্কিন সৈন্যদের দেহাবশেষের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কোনও সম্পর্ক নেই।

২০১১ সালের ফুটেজ 

ক্লিপটির কিফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চে এর একটি দীর্ঘ সংস্করণ পাওয়া যায়। ফটোগ্রাফার প্যাট্রিক হিউজেস ২০১১ সালের ৯ জুন তারিখে ইউটিউবে ভিডিওটি প্রকাশ করেন এবং যার শিরোনাম ছিল: “ডিগনিফায়েড ট্রান্সফার”(আর্কাইভ লিংক)। 

ভিডিওটির বিবরণে বলা হয়, এটি ২০১১ সালের ৮ জুন ভোরে ধারণ করা হয়। এতে ইরাকের একটি সামরিক অভিযানে নিহত চার আমেরিকান সৈন্য—এমিলিও ক্যাম্পো, মাইকেল কুক, ক্রিস্টোফার ফিশবেক এবং মাইকেল অলিভিয়েরির দেহাবশেষ স্থানান্তর দেখানো হয়েছে।  


অনলাইনে ছড়ানো ভিডিওটি মূল ভিডিওটির ১ মিনিট ৩৯ সেকেন্ড থেকে কেটে নেয়া হয়, যেখানে একই বিমান, সৈন্য এবং নীল রঙের একটি গাড়ি দেখা যায়। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো ক্লিপ(বামে) এবং ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওর তুলনামূলক স্ক্রিনশট

তিনি ডেলাওয়্যারের ডোভার এয়ার ফোর্স বেসে ফুটেজটি ধারণ করেছিলেন বলে এএফপি ফ্যাক্ট চেককে নিশ্চিত করেন হিউজ।   

এএফপি-কে তাঁর তোলা আরও কিছু ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমিই এই ফুটেজের মূল ভিডিওগ্রাফার এবং আপলোডার।”  

মূল ইউটিউব ভিডিওতে শনাক্ত হওয়া চার সৈনিকের নাম ২০১১ সালের ৮ জুন ডেলাওয়্যার ঘাঁটিতে তাঁদের দেহাবশেষ হস্তান্তর সংক্রান্ত মার্কিন বিমান বাহিনীর ওয়েবসাইটের একটি ঘোষণায় পাওয়া যায়(আর্কাইভ লিংক)। 

ডোভার বিমান ঘাঁটিতে হস্তান্তর অনুষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট ছবিগুলো একই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় এবং মার্কিন বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে রোলান্ড বালিককে ছবির জন্য ক্রেডিট দেওয়া হয়(আর্কাইভ লিংক)। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো ক্লিপ এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওয়েবসাইটের ছবির তুলনামূলক স্ক্রিনশট

২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ডিফেন্স ভিজ্যুয়াল ইনফরমেশন ডিস্ট্রিবিউশন সার্ভিস (ডিভিআইডিএস) মূল ভিডিওতে উল্লিখিত চারজনসহ মোট পাঁচজন সৈন্যের ছবি প্রকাশ করে। এতে বলা হয় তাঁরা ২০১১ সালের ৬ জুন ইরাকে নিহত হন (আর্কাইভ লিংক)। 

এএফপি ফ্যাক্ট চেক আরবিতেও অসত্য দাবিটি খণ্ডন করেছে।

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ