ইরান ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদির যুদ্ধ ঘোষণার অসত্য দাবিতে বিকৃত ভিডিও প্রচার

ফ্রান্সে জি-৭ এর সম্মেলনের আগে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ যখন দীর্ঘ হচ্ছে, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তান ও ইরানের বিরুদ্ধে “পরোক্ষভাবে” যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন দাবি করে অনলাইনে একটি  ভিডিও ছড়ানো হয়। তবে দাবিটি অসত্য; দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এনএক্সটি সামিটে মোদির দেয়া ভাষণের ভিডিও থেকে ফুটেজটি বিকৃত করা হয়েছে। মূল ফুটেজটির সম্প্রচারকারীও দাবিটি অস্বীকার করেছে। 

ফেসবুকে ১৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে ছড়ানো একটি পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “গ্রেটার ইজরাইল এবং অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার জন্য ইরানের পতন ঘটাতে হবে বলেছেন মোদি!” 

পোস্টের সাথে যুক্ত ৫৩ সেকেন্ডের একটি ফুটেজে মোদিকে হিন্দি ভাষায় ভাষণ দিতে দেখা যায়। ভিডিওতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিন্দি ভাষায় বলেন, “সমগ্র অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানোর জন্য ইরানকে জবাবদিহি করতে হবে।”

এ বিষয়ে ভিডিওতে মোদি আরও বলেন: “আমাদের লক্ষ্য পাকিস্তান এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বর্তমান ইরানি শাসনের পতন এবং দেশটির ওপর ইসরায়েলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। বৃহত্তর ইসরায়েল ও অখণ্ড ভারতের জন্য এটাই একমাত্র পথ।”

ক্লিপটির উপরের ডান কোণায় মাল্টিমিডিয়া সংবাদ সংস্থা এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনালের লোগো “এএনআই” স্পষ্টভাবে দেখা যায়। 

Image
এএফপির যোগ করা ক্রস চিহ্নসহ ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য পোস্টের স্ক্রিনশট

একই ফুটেজ অনুরূপ দাবিতে ফেসবুকে ছড়ানো হয়।

১২ মার্চ ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এনএক্সটি সামিট ২০২৬-এ মোদি ভাষণ দেন। সেখানে তিনি ভারতের জ্বালানি ও সবুজ অগ্রগতির কৌশলের রূপরেখা তুলে ধরেন(আর্কাইভ লিংক)।

তবে পাকিস্তান ও ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে মোদির ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষণের দাবিটি অসত্য।

মোদি যা বলেছেন

মোদির ভাষণের একদিন পর এএনআই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে সব দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মোদি। কিন্তু ভাষণে তিনি রাজনৈতিক মন্তব্য থেকে বিরত থাকেন(আর্কাইভ লিংক)। 

সংবাদ সংস্থাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোদির ভাষণের বেশ কয়েকটি ক্লিপ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিতেই তাঁকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে দেখা যায়নি। 

Image
২৭ মার্চ ২০২৬ তারিখে এএনআই-এর এক্স টাইমলাইন থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

পরে ১৩ মার্চ একটি এক্স পোস্টে দাবিটি খণ্ডন করেছে এএনআই (আর্কাইভ লিংক)। 

পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “নিচের ‘এক্স’ হ্যান্ডেলটি একটি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও পোস্ট করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমন কোনো মন্তব্য করেননি।”

Image
অসত্য দাবিটি খণ্ডন করে এএনআই এর এক্স পোস্ট

এএনআই কর্তৃক উল্লিখিত এক্স অ্যাকাউন্টটি নাইজেরিয়ান ইনফ্লুয়েন্সার এবং ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক আদামা গরবার, যিনি দেশটির ২০২৩ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে অপতথ্য ছড়ানোর জন্য পরিচিত(আর্কাইভ লিংক এখানে, এখানে এবং এখানে)। 

এরপর সামাজিক মাধ্যম এক্স গরবার পোস্টে একটি ডিসক্লেমার যোগ করে দেয়। যেখানে বলা হয়েছে, এনএক্সটি ২০২৬-এ মোদির ভাষণের ক্লিপটি “ম্যানিপুলেটেড মিডিয়া”(আর্কাইভ লিংক)। 

Image
কুতথ্যের ট্যাগটি হাইলাইট করে ২৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য এক্স পোস্টের স্ক্রিনশট

এক্স-এ গরবার টাইমলাইনে ইরান যুদ্ধ সম্পর্কিত কন্টেন্ট দেখা যায়, যার কিছু বিভ্রান্তিকর বা অসত্য। 

বিশ্লেষণের জন্য এএফপি ফ্যাক্ট চেক ক্লিপটির অডিও প্রতিলিপি করে। 

১২ মার্চ এএনআই-এর পোস্ট করা মোদির ভাষণের একটি ক্লিপ এবং গরবা ও অন্যদের শেয়ার করা অসত্য ভিডিওর একটি তুলনায় দেখা যায়, মূল অডিওটি বিকৃত করা হয়েছিল(আর্কাইভ লিংক)। 

এএনআই এর শেয়ার করা ইংরেজি ক্যাপশনে বলা হয়, “আজকাল এলপিজি নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিছু লোক আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাইছে। এই মুহূর্তে আমি এ বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।” 

এতে আরও বলা হয়, “কিন্তু আমি অবশ্যই বলব যে, এমনটা করার মাধ্যমে তাঁরা নিজেদেরকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করছে এবং সমগ্র দেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে।” 

সরবরাহ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে এবং বিদেশি জ্বালানি উৎসের ওপর ভারতের নির্ভরতা কমাতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে গুরুত্বারোপ করেন মোদি। 

Image
বানোয়াট ভিডিও(বামে) এবং এএনআই প্রকাশিত ক্লিপের তুলনামূলক স্ক্রিনশট

অসত্য পোস্টের কথিত মন্তব্যে নিয়ে কোনো রেকর্ড নেই। তাঁর বক্তব্যের কোথাও বাংলাদেশের উল্লেখ ছিলো না। 

ভেরিফিকেশন টুল ইনভিড উইভেরিফাই ব্যবহার করে ক্লিপটির অডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, অডিওর কিছু অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ৬৭ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। 

Image
হিয়া টুলের ফলাফলের স্ক্রিনশট

এর আগে এএনআই-এর ফুটেজ বিকৃত করে ছড়ানো একটি দাবি খণ্ডন করেছে এএফপি ফ্যাক্ট চেক। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ইরান বিষয়ে মন্তব্য করেছেন বলে ওই ফুটেজে অসত্যভাবে দাবি করা হয়। 

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ