বাংলাদেশ-পাকিস্তান বৈঠকের পর ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধানের এআই-এর মাধ্যমে বিকৃত করা অসত্য ভিডিও প্রচার

দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধানদের বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত বলেছে যে তারা ব্যাপারটির ওপর 'নজর রাখছে’। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে যে ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধান ওই বৈঠকের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছেন। ভিডিও ক্লিপটি জেনারেল অনিল চৌহানের। সেখানে তিনি একটি স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, অসত্য ভিডিওটি আসল ফুটেজটি থেকে বিকৃত করা হয়েছে এবং এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে সম্পাদিত ভিডিওর বৈশিষ্ট্য এবং অসঙ্গতি রয়েছে।

৩০ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটিতে ভারতের চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহানকে একটি মঞ্চে বক্তৃতা দিতে দেখা যাচ্ছে। ক্লিপটি ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফেসবুকে শেয়ার করা হয়, যার ৫৪০,০০০ বার দেখা হয়েছে।  

চৌহানকে ওই ক্লিপে বলতে শোনা যায়, "আমরা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে গড়ে ওঠা প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি, যা ভারতের জন্য উল্লেখযোগ্য ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে।" এরপর তিনি বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে কথা বলেন এবং সতর্ক করে দেন যে এটি ঢাকার বিমান সক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে পারে ও এই অঞ্চলের "কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে"।

জেনারেল আরও বলতে শোনা যায়, "ভারতকে অবশ্যই সতর্কতার সাথে এই ধরনের পরিবর্তনগুলো পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ করতে হবে।"

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হাসান মাহমুদ খান ২০২৬ সালের ৬ই জানুয়ারি ইসলামাবাদে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী প্রধান আহমেদ বাবর সিধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতে তারা জেএফ-১৭ থান্ডার জেট বিমান সংগ্রহের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করেন। এই বিমানগুলো মে ২০২৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের মারাত্মক সংঘাতের সময় ভারতের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা হয়েছিল (আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)। 

একটি ‘সম্ভাব্য’ জেট বিমান বিক্রির প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, তারা “ভারতীয় জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে এমন সমস্ত পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছেন" (আর্কাইভ লিংক)। 

Image
এএফপির যোগ করা ক্রস চিহ্নসহ ২১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

ভিডিওটি একই দাবিতে ফেসবুকে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে।

তবে, ভিডিও ফুটেজটি এআই দিয়ে বিকৃত করা হয়েছে এবং চৌহানের মূল বক্তব্যে বাংলাদেশের কোনও কথা উল্লেখ ছিল না।

সেনাপ্রধান যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধানদের বৈঠকের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, এমন কোনো সরকারি প্রতিবেদন নেই।

অসত্যভাবে ছড়ানো ভিডিওটির কিফ্রেম ব্যবহার করে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, ৭ জানুয়ারী, ২০২৬ তারিখে প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়ার এক্স অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল (আর্কাইভ লিংক)। 

পোস্টটিতে বলা হয়েছে, চৌহান ২০১৬ সালে প্রয়াত প্রাক্তন উপ-সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শ্রীনিবাস কুমার সিনহার স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন।

চৌহানের বক্তৃতার মূল বিষয়বস্তু ছিল, "লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিনহা, ভারতের রণকৌশলগত চিন্তার নেতৃত্ব, জাতি গঠন এবং একবিংশ শতাব্দীতে তাঁর প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্রে এক স্থায়ী উত্তরাধিকার"।

Image
এক্সে প্রকাশিত আসল ভিডিওর স্ক্রিনশট

সম্পূর্ণ ভাষণটি একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের ইউটিউব সংস্করণ সরাসরি সম্প্রচারও করেছিল (আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)। 

জেনারেল চৌহান তাঁর বক্তৃতার কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের কথা উল্লেখ করেননি। এর পরিবর্তে, তিনি সিনহাকে নিয়ে বিভিন্ন ঘটনার কথা স্মরণ করেন এবং তাঁর প্রভাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের তাঁর কাছ থেকে শেখার মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন।

এএফপি বাফেলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপফেক-ও-মিটার টুলটির মাধ্যমে ভিডিও ক্লিপটি পরীক্ষা করে দেখেছে এবং এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯ শতাংশ বলে জানিয়েছে (আর্কাইভ লিংক)। 

Image
ডিপফেক-ও-মিটার টুলের ফলাফলের স্ক্রিনশট

ভিডিও ক্লিপটিতে চৌহানের ঠোঁটের নড়াচড়াও অডিওর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যা থেকে বোঝা যায় যে ফুটেজটি এআই ব্যবহার করে বিকৃত করা হয়েছে।

এএফপি বাংলাদেশ সম্পর্কিত অন্যান্য অসত্য দাবি খণ্ডন করেছে এখানে

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ