জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের ভিডিও বিকৃত করে অনলাইনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি

মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে ২০২৫ সালের নভেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনের প্রধান ভলকার তুর্কের একটি ভিডিও বিকৃত করে অনলাইনে ছড়ানো হয়। ভলকার তুর্ক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলার “রায়” ঘোষণা করেছেন বলে পোস্টে অসত্যভাবে দাবি করা হয়। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এক বিবৃতিতে এএফপিকে জানিয়েছে, তুর্ক মূলত ২০২৪ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানের জটিল মামলাগুলোকে আইসিসিতে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। 

১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দায়ের করা মামলার মধ্যে ২টি মামলার রায় শেখ হাসিনার পক্ষে এসেছে, বাকিগুলো চলমান রয়েছে।”

ক্যাপশনে আরও বলা হয়, “এছাড়া নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবৈধ আন্তর্জাতিক আদালতের যে রায় রায় ঘোষণা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এসবে জড়িতদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত দ্রুত ব্যবস্থা নিবে বলে জানিয়েছেন।” 

পোস্টে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের একটি ভিডিও যুক্ত করা হয়, যেখানে তিনি বলেন, “কিছু মামলার বিচার করা এবং পরিচালনা খুবই  কঠিন। এ ধরনের মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোই ভালো। তবে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের বিবেচ্য।” 

“বিক্ষোভকারীদের দমাতে” এবং সাবেক সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

“সাবেক ক্ষমতাসীন দলের” বিরুদ্ধে ব্যক্তি বিশেষের “মারাত্মক প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড” তাঁরা নথিভূক্ত করেছেন বলে ভিডিওটির পরের অংশে তাঁকে বলতে দেখা যায়। 

Image
এএফপির যোগ করা ক্রস চিহ্নসহ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে নেয়া অসত্য ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

১৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেয়( আর্কাইভ লিংক এখানেএখানে). 

জাতিসংঘের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের অভ্যুত্থানে ১,৪০০ জন খুন হন। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারকে কেন্দ্র করে ট্রাইব্যুনালটি গঠিত। 

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে তাকে দোষী সাবস্ত করা এবং মৃত্যুদণ্ডের ঘোষিত রায়কে “পক্ষপাত দুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত” বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। এছাড়া তিনি মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেন(আর্কাইভ লিংক).

ভিডিওটি একই দাবিতে ফেসবুক পোস্টে অন্যত্র ছড়ানো হয়েছে। 

তবে অনলাইনে ছড়ানো ভিডিওটি তুর্কের বক্তব্যের কয়েকটি অংশকে বিভ্রান্তিকর ভাবে এডিট করে তৈরি করা হয়েছে। 

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এক ইমেইলে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনার (ওএইচসিএইচআর) এএফপিকে জানান, তুর্কের দাবিতে ছড়ানো মন্তব্য এবং উদ্ধৃতিগুলো “নিশ্চিতভাবে তাঁর নয়”। 

জোড়াতালি দেয়া ভিডিও

তবে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান মোহাম্মদ ইউনুস অথবা বাংলাদেশের বর্তমান কোনো নেতার বিরুদ্ধে কোন মামলা আইসিসির আইসিসির ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি (আর্কাইভ লিংক).

আইসিসির প্রসিকিউটর অফিস এএফপিকে জানিয়েছেন যে, দপ্তরটি বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কোনো প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেনি। 

২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আইসিসির পাবলিক ইনফরমেশন ইউনিট এএফপিকে জানান, “আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ দেশটির পরিস্থিতি প্রসিকিউটর অফিসে উপস্থাপন করেনি।”

তবে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি হতে বাংলাদেশে সংগঠিত কথিত অপরাধের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ পেয়েছে বলে জানিয়েছে দপ্তরটি। কিন্তু মূল্যায়ন শেষে এই মুহুর্তে প্রাথমিক পরীক্ষ-নিরীক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দপ্তরটি। 

এদিকে এক কিওয়ার্ড সার্চে প্রেস কনফারেন্সের ফুটেজটি পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বিক্ষোভের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশের ফুটেজটি ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে নিজেদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে আপলোড করে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন(আর্কাইভ লিংক).  

Image
অসত্য পোস্ট (বামে) এবং জাতিসংঘের প্রেস কনফারেন্সের ক্লিপের তুলনামূলক স্ক্রিনশট

অসত্য পোস্টের প্রথম অংশটি জাতিসংঘের ওয়েবসাইটের ভিডিওর ২২ মিনিটের ফুটেজের সাথে মিলে যায়। যেখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, যেসব মামলা “পরিচালনা করা কঠিন” সেগুলো বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নিতে পারেন(আর্কাইভ লিংক).

তিনি বলেন, “এটি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে।”

এডিটেড ভিডিওর পরের অংশের সাথে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে তুর্কের বক্তব্যের ১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ফুটেজের সাথে মিল রয়েছে। এই অংশে তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং হাসিনার দল ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত “গুরুতর প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড” নিয়ে কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনের কোনো পর্যায়েই তুর্ক বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হওয়ার কিংবা কোনো রায় ঘোষণার কথা বলেননি।

এএফপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কিত অন্যান্য অসত্য দাবি খণ্ডন করেছে এখানে। 

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ