মিয়ানমারের উপজাতি সংঘর্ষের ফুটেজকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর পুলিশ বাহিনীর অনুপস্থিতির মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কমিশনপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের কয়েক দফায় ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত লোকজনের মধ্যে হাতাহাতির ফুটেজটি বাংলাদেশ সৈনিকদের নয়, যদিও সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে তেমনটিই দাবি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ভিডিওটি মিয়ানমারে ধারণ করা এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যে দুটি সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে ভূমি বিরোধের জেরে সংঘর্ষের ঘটনার। 

গত ২৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে একটি ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, "বাংলাদেশের সুনাম ধন্য এক বাহিনীর নাম বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ছিল। সেই সেনাবাহিনী সম্মান মাটির সাথে গেছে অবৈধ সরকার ইউনূস গং এবং সমন্বয়ক নামের কুলাঙ্গারদের পৃষ্ঠপোষকতায়"।

পোস্টে সংযুক্ত ১৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত এবং সশস্ত্র একদল লোককে একে অন্যের সাথে মারামারি করতে দেখা যায়। 

Image

হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুর্বল এবং বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য দেশজুড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা অভিযান শুরু করার পর ভিডিওটি অনলাইনে ছড়ানো হয় (আর্কাইভ লিংক)। 

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থান ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করে। শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং তখন থেকে ভারতেই বাস করছেন। আর নোবেল জয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হাসিনার স্থলাভিষিক্ত হন (আর্কাইভ লিংক)। 

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিকভাবে ৬০ দিনের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপর চতুর্থ দফায় এই ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে (আর্কাইভ লিংক)। 

একই সাথে আগস্ট অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে গায়েব হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ডস এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সদস্যদের নিয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী অভিযান শুরু পরিচালনা করছে (আর্কাইভ লিংক)।

সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যকার সংঘর্ষের দাবিতে ভিডিওটি ফেসবুকে অন্যত্র ছড়ানো হয়েছে, তবে ভিডিওটি মিয়ানমারে ধারণ করা, বাংলাদেশে নয়। 

মিয়ানমারে গোষ্ঠিগত সংঘর্ষ 

ক্লিপটির কিফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চে ২৮ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ইউটিউবে আপলোড করা ভিডিওটির একটি স্পষ্ট সংস্করণ পাওয়া যায় (আর্কাইভ লিংক)। 

বার্মিজ ভাষার ক্যাপশনে বলা হয়, "তারা একজন অন্যজনের সাথে লড়াই করছে" এবং এতে #আর্মি, #মিলিটারি এবং #মিয়ানমার যোগ করা হয়। 

আরো কিওয়ার্ড সার্চে ২৭ জানুয়ারি ফেসবুকে শেয়ার করা একটি দীর্ঘ সংস্করণ পাওয়া যায় (আর্কাইভ লিংক)। 

ভিডিওটির ওপর জুড়ে দেয়া লেখায় বলা হয়, "কেআইএ এবং টিএনএলএ-র মধ্যে ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ (জানুয়ারি ২৬, ২০২৫, মং ইউ--কেএসএসএম)"। 

ফেসবুক ক্লিপটির ৬মিনিট ৭ সেকেন্দ্রের দৃশ্যের সাথে অসত্য পোস্টে ছড়ানো ফুটেজের মিল পাওয়া যায়। 

Image
অসত্য পোস্টে ছড়ানো ক্লিপ (বামে) এবং ফেসবুকে আপলোড করা ভিডিওটির তুলনামূলক স্ক্রিনশট

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে উত্তর-পূর্ব কাচিন রাজ্য এবং উত্তর শান রাজ্যে লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছে কাচিন ইন্ডিপেন্ডেন্স আর্মি (কেআইএ) এবং তা'আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) (আর্কাইভ লিংক এখানেএখানে)। 

শান রাজ্যের নামহপাটকা শহরে একটি কেআইএ চেকপয়েন্টের কাছে ভূমির বিরোধের জের ধরে দুটি সশস্ত্র জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে স্থানীয় গণমাধ্যম মিজিমার প্রতিবেদনে বলা হয়  (আর্কাইভ লিংক)।

ভিডিওটিতে লোকজনকে বার্মিজ ভাষায়, "হাত তুলবে না", "আমাকে ধরবে না" এবং "তোমরা সবাই মাতাল" চিৎকার চেচামেচি করতে দেখা যায়। 

লোকজনের পোশাকে থাকা ব্যাজগুলোর সাথে কেআইএ এবং টিএনএলএ-র বিদ্রোহীদের ব্যবহৃত ব্যাজের মিলে পাওয়া যায় (আর্কাইভ লিংক এখানেএখানে)।

Image
ফেসবুক পোস্টের ভিডিও (বামে) এবং দ্য ডিপ্লোম্যাট কর্তৃক প্রকাশিত কেআইএ প্রতীকের একটি ছবির মধ্যেকার মিল এএফপি কর্তৃক চিহ্নিত করে একটি তুলনামূলক স্ক্রিনশট
Image
ফেসবুক পোস্টের ভিডিও (বামে) এবং এএফপি কর্তৃক প্রকাশিত টিএনএলএ-র প্রতীকের একটি ছবির মধ্যেকার মিল এএফপি কর্তৃক চিহ্নিত করে একটি তুলনামূলক স্ক্রিনশট

বাংলাদেশ নিয়ে ছড়ানো অন্যান্য বিভ্রান্তির তথ্য খণ্ডন করে এএফপির প্রতিবেদন পড়ুন এখানে। 

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ