লন্ডনে শেখ হাসিনার ২০০৭ সালের ভিডিওকে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার হিসেবে অসত্যভাবে প্রচার

ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে জুন মাসে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এরপর সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে একটি ভিডিও ছড়িয়ে অসত্যভাবে দাবি করা হয়েছে যে, মৃত্যুদণ্ডের সাজার আদেশ সত্বেও খুব দ্রুত বাংলাদেশে ফিরবেন বলে ভারতে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন হাসিনা। তবে ফুটেজটি এনডিটিভিতে হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশের প্রায় দুই দশক আগের। এটি ২০০৭ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে(এলএসই) বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বের সময় ধারণ করা হয়েছিল।

৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “বিগ ব্রেকিং ৫ তারিখ দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা, ভারতের দিল্লিতে প্রকাশ্যে আসলেন।” 

ভিডিওর নিচের অংশে জুড়ে দেয়া লেখায় বলা হয়, “৬ তারিখ দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা, ভারতের একটি হোটেলে হঠাৎ সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে শেখ হাসিনা।”

ক্লিপটি ১ লাখ ৩০,০০০ বারের বেশি ভিউ এবং ১,২০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। এতে হাসিনাকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে দেখা যায়। এ সময় কেউ একজন তাকে জিজ্ঞেস করেন যে, তিনি ৬ তারিখে দেশে ফিরবেন কিনা? 

Image
এএফপির যোগ করা লাল ক্রস চিহ্নসহ ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

২৯ জুন এনডিটিভির ওয়েবসাইকে হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ার পর একই ভিডিও অনুরূপ দাবিতে অন্যত্র ফেসবুকে ছড়ানো হয়। ইমেইলে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে জানান যে, তিনি “এই বছরের” মধ্যে বাংলাদেশে ফিরবেন। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বলেননি(আর্কাইভ লিংক)। 

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন অভ্যূত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে যান এবং সেখানে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নেন। তখন থেকে তাকে আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি এবং ঢাকার একটি আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অবজ্ঞা করে তিনি সেখানে অবস্থান করছেন(আর্কাইভ লিংক)। 

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংস আক্রমণের দায়ে ১০ মে ২০২৫ তারিখে হাসিনার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ওই বছর আদালত তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেয়(আর্কাইভ লিংক)।

তবে ফেসবুকে ছড়ানো ক্লিপটি শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের নয়। ভিডিওটি ২০০৭ সালে লন্ডনে ধারণ করা হয়েছিল।  

২০০৭ সালের ভিডিও 

অসত্যভাবে ছড়ানো ভিডিওটির কিফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চে ১৬ মে ২০০৭ সালে ইউটিউবে প্রকাশিত অনুরূপ একটি ফুটেজ পাওয়া যায়(আর্কাইভ লিংক)। 

ফুটেজটির ক্যাপশনে বলা হয়, “প্রফেসর ইউনূস সম্পর্কে শেখ হাসিনা।” এতে লোকজনে পরিপূর্ণ একটি কক্ষে তাকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে দেখা যায়। 

ভিডিওটির শুরুতে একজনকে বলতে শোনা যায়, “১ মে ২০০৭ লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের বাংলাদেশ স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শক, শ্রোতা এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নে বিভিন্ন ভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনা তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন।” 

Image
Screenshot comparison of the false post (L) and the YouTube video taken on July 7, 2026

আরও কিওয়ার্ড সার্চে ১৭ জুলাই ২০০৭ সালে তানভীর আহমেদ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ভিডিওটির একটি দীর্ঘ সংস্করণ পাওয়া যায়। তানভীর সাংবাদিক হিসেবে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল এস-এ কর্মরত ছিলেন(আর্কাইভ লিংক)।

অসত্যভাবে ছড়ানো ভিডিওটির সাথে ইউটিউবের প্রথম দুই মিনিটের ফুটেজের মিল রয়েছে। 

বর্তমানে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম পলিটিকা নিউজের প্রধান সম্পাদক তানভীর ৭ জুলাই এএফপিকে বলেন, “২০০৭ সালের ১ মে তারিখে চ্যানেল এস টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক থাকার সময় আমি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছিলাম। যা লন্ডনের চ্যানেল এস টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিলো। যদিও ভিডিওটি আমার ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে ১৭ জুলাই ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়।”

ওই সময় বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ব্যক্তিগত কাজে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে যুক্তরাজ্য সফর করেন। সফরের মাঝে তখনকার সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে(আর্কাইভ লিংক)। 

তবে ২০০৭ সালের ৭ মে তাকে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চাঁদাবাজির মামলায় ১৬ জুন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়(আর্কাইভ লিংক)।

এএফপি এর আগেও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ছড়িয়ে পড়া অন্যান্য অসত্য দাবি খণ্ডন করেছে।  

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ