সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে কোভিড সংক্রান্ত ভুয়া খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে তারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তির লাশের ময়নাতদন্ত করে দেখেছে মানব শরীরে কোভিড-১৯ ভাইরাস হিসেবে নয়, বরং একটি ব্যাকটেরিয়া হিসেবে বিদ্যমান; যা বিকিরণের সংস্পর্শে এসে রক্তকে জমাট বাঁধিয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। এই দাবিটি অসত্য। সিঙ্গাপুর সরকার বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা কোভিড আক্রান্ত কোনো রোগীর শরীর ময়নাতদন্ত করেনি এবং তারা এমনটাও বলেনি যে, কোভিড-১৯ একটি ব্যাকটেরিয়া।

দৈনিক মানবজমিন তাদের ওয়েবসাইটে গত ১৬ জুলাই 'কোভিড-১৯ আসলে ব্যাকটেরিয়া' শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

( Qadaruddin SHISHIR)

মানবজমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ''সিঙ্গাপুর বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা কোভিড-১৯ লাশের ময়নাতদন্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তদন্তের পরে দেখা গেছে, কোভিড-১৯ ভাইরাস হিসেবে বিদ্যমান নয়, বরং এটি একটি ব্যাকটিরিয়াম যা বিকিরণের সংস্পর্শে এসে রক্তকে জমাট বাঁধিয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।''

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ''এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রক কোভিড-১৯ এর চিকিৎসার প্রটোকল পরিবর্তন করেছে এবং পজেটিভ রোগীদের অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ দিতে শুরু করেছে। সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকরা কোভিড রোগীদের ১০০ মিলিগ্রাম ইম্রোমাক ওষুধ দেয়া শুরু করেন। ফলস্বরূপ, রোগীরা সুস্থ এবং তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে শুরু করে।''

এরপর এই খবরটি বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপে ছড়িয়েছে। তেমন কয়েকটি পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে

( Qadaruddin SHISHIR)

কিন্তু মানবজমিনের প্রতিবেদনের এসব দাবি ভুয়া।

গত কিছুদিন ধরে বিভিন্ন দেশের সামাজিক মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে এমন খবর ছড়ানোর প্রেক্ষিতে গত ১৫ জুন ২০২১ তারিখে সিঙ্গাপুর সরকারের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।

তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনলাইনে ছড়ানো এসব তথ্য ভুয়া। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো কোভিড লাশের ময়নাতদন্ত করেনি এবং এটি কোনো ভাইরাস নয় এমন কথাও বলেনি।

সিঙ্গাপুর সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, ''সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে বিভিন্ন বার্তা আদানপ্রদান প্লাটফর্মে একটি ভুয়া বার্তা ছড়িয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে যে, একজন কোভিড আক্রান্ত রোগীর শরীরে ময়নাতদন্ত করার পর সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ আবিষ্কার করে কোভিড-১৯ আসলে কোনো ভাইরাস হিসেবে মানবদেহে অবস্থান করে না। বরং এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া হিসেবে বিদ্যামন থাকে যা রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এসে রক্ত জমাট বাঁধিয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।''

''বার্তাটিতে আরো দাবি করা হয় যে, কর্তৃপক্ষ কোভিড-১৯ এর চিকিৎসাতেও পরিবর্তন এনেছেন এবং তারা কোভিড পজিটিভ রোগীদেরকে এসপিরিন প্রদান করছেন। এই সবগুলো দাবিই অসত্য এবং বার্তাটি সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরণ করা হয়নি'', বলা হয়েছে সরকারের বিবৃতিতে।

( Qadaruddin SHISHIR)

সিঙ্গাপুর সরকার আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা কোনো কোভিড আক্রান্ত রোগীর শরীরে ময়নাতদন্ত পরিচালনা করেনি এবং এর ফলে কোভিড-১৯ চিকিৎসা পদ্ধতিতেও কোনো পরিবর্তন আনেনি।

( Qadaruddin SHISHIR)

কোভিড-১৯ ভাইরাসকে ব্যাকটেরিয়া হিসেবে অভিহিত করে ভুয়া খবর এর আগেও বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছিলো। এএফএপি ইংরেজিতে এ নিয়ে ২০২০ সালের ৪ জুন একটি ফ্যাক্ট চেক প্রকাশ করে। প্রতিবেদনটি পড়ুন এখানে

ব্যাকটেরিয়া মিথ

বিজ্ঞানীরা জানান যে, কোভিড-১৯ রোগটি হয়ে থাকে এক ধরনের করোনাভাইরাসের কারণে, ব্যাকটেরিয়ার কারণে নয়। ২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের উহান শহরে প্রথম ধরা পড়ে এই রোগ। এরপর থেকে এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

''২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি বিজ্ঞানীরা উহানের কয়েকজন রোগীর দেহে নতুন এই করোনাভাইরাস (CoV) চিহ্নিত করেন'', এ কথা বলা হয়েছে বিজ্ঞান বিষয়ক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পিয়ার রিভিউ জার্নাল দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এই গবেষণায়।

২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইন্ট্যারনেশনাল কমিটি অন ট্যাক্সোনোমি অব ভাইরাসেস (আইসিটিভি) নতুন এই ভাইরাসের নামকরণ করে 'সিভিয়ার একিউরেট রেস্পাইরেটোরি সিন্ড্রোম করোনাভাইরাস ২', বা 'SARS-CoV-2'। ২০০৩ সালের সার্স মহামারির জন্য দায়ী করোনাভাইরাসের সাথে নতুন এই ভাইরাসের জেনেটিক সম্পর্কের কারণে এই নামকরণ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, নেপাল, কোরিয়া, ফ্রান্স ইত্যাদি সব দেশে কোভিড-১৯ রোগীদের উপর চালানো বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন রোগটি ভাইরাস থেকে ছড়ানো, ব্যাকটেরিয়া থেকে নয়।

কোভিড-১৯