পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার দাবিতে পুরনো ও অপ্রাসঙ্গিক ভিডিওকে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার

মে মাসে অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি(বিজেপি) জয় লাভের পর থেকে সেখানে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তবে অনলাইনে ছড়ানো আগুনে জ্বলতে থাকা ভবনের ভিডিওগুলোর সাথে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এ রাজ্যের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার কোনো সম্পর্ক নেই। ভিডিওগুলো নির্বাচনের পূর্বের এবং ঘটনাস্থলগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বলে নিশ্চিত হয়েছে এএফপি। 

৫ মে ২০২৬ তারিখের ছড়ানো একটি ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “কলকাতার অবস্থা ভালো নয়, মানুষের বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদির লোকেরা।” ভিডিওটি ৮৭,০০০ বার শেয়ার করা হয়েছে। 

সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি বিপুল ভোটে জয়ী হয়। এর একদিন পরেই ভিডিওটি অনলাইনে ছড়ানো হয়(আর্কাইভ লিংক)। 

ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণা ব্যাপক বিক্ষোভের মুখোমুখী হয়। ওই পদক্ষেপকে ‘অযোগ্য ভোটারদের অপসারণ’ হিসেবে অভিহিত হলেও সমালোচকদের মতে পদক্ষেপটি ছিল প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীসহ অন্তত পাঁচজন নিহত হন।

Image
এএফপির যোগ করা লাল ক্রস চিহ্নসহ ১২ মে ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

৫ মে ২০২৬ তারিখে ছড়ানো একটি ফেসবুক রিলে এক ব্যক্তিকে একটি জ্বলন্ত ভবনের ভিডিও নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়।  ভিডিওটির ক্যাপশনে বলা হয়, “মসজিদকে কিভাবে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে আগাছা নেতারা।”

এছাড়া ৭ মে ২০২৬ তারিখে ছড়ানো অন্য একটি পোস্টে পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে হিন্দুরা কলকাতার একটি মসজিদে আগুন দিয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। পোস্টের সাথে যুক্ত ভিডিওতে গম্বুজবিশিষ্ট একটি ভবন থেকে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী ও আগুনের শিখা উঠতে দেখা যাচ্ছে। 

Image
এএফপির যোগ করা লাল ক্রস চিহ্নসহ ১২ মে ২০২৬ তারিখে নেয়া অসত্য ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

ভিডিওগুলো অনুরূপ দাবিতে ফেসবুকে অন্যত্র ছড়ানো হয়। 

তবে ক্লিপগুলো পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগের ঘটনার এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ধারণ করা হয়েছে।

নেপালের বিক্ষোভ 

অসত্যভাবে ছড়ানো প্রথম ভিডিওটির কিফ্রেম নিয়ে গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত এএফপির একটি ছবির সাথে ভিডিওটির মিল রয়েছে। ছবিতে একই জ্বলন্ত ভবন দেখা যায়।

ছবির বিবরণে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের ওপর পুলিশের দমনপীড়নের পর বিক্ষোভকারীরা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অবস্থিত সুপ্রিম কোর্ট ভবনে আগুন দেয়। দুর্নীতি ও নাজুক অর্থনীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এক ব্যাপক আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভের তোপে নেপালের সাবেক সরকারের পতন ঘটে(আর্কাইভ লিংক)। 

Image
এএফপির তোলা নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত নেপালের সুপ্রিম কোর্টের সামনের ছবি

ভিডিওতে একই দৃশ্য দেখা যায় বলে নিশ্চিত করেছে সুপ্রিম কোর্ট ভবনের ছবিটি ধারণকারী এএফপির ফটোগ্রাফার। ভিডিওটির বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভকারীদের নেপালের জাতীয় পতাকা বহন করতে দেখা যায়।

ভিডিওটি কাঠমান্ডুতে অবস্থিত সুপ্রিম কোর্ট চত্বরের গুগল স্ট্রিট ভিউ ছবির সাথেও মিলে যায় (আর্কাইভ লিংক)। 

Image
অসত্য পোস্টের ভিডিও(বাম) এবং গুগল ম্যাপের ছবির মধ্যকার মিল এএফপি কর্তৃক হাইলাইট করে তুলনামূলক স্ক্রিনশট

বাংলাদেশে ভাঙচুর

অন্য একটি রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, দ্বিতীয় ক্লিপটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সময় টিভি ২৯ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তাদের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করে(আর্কাইভ লিংক)। “

“অসামাজিক কার্যকলাপের” অভিযোগ এনে একদল জনতা দিনাজপুরের ‘জীবন মহল পার্ক’-এ হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো ক্লিপ(বামে) এবং ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওর তুলনামূলক স্ক্রিনশট
Image
অসত্য পোস্টের ভিডিও(বাম) এবং গুগল ম্যাপের মধ্যকার মিল এএফপি কর্তৃক হাইলাইট করে তুলনামূলক স্ক্রিনশট

অন্যান্য সংবাদমাধ্যমও ভাঙচুর হওয়া পার্কটির অনুরূপ ছবি প্রকাশ করেছে (আর্কাইভ লিংক)।

ভিডিওতে দৃশ্যমান অবকাঠামোর সাথে দিনাজপুরের জীবন মহল পার্কের গুগল ম্যাপের ছবির মিল দেখা যায় (আর্কাইভ লিংক)। 

কাশ্মিরের মসজিদে আগুন

অসত্যভাবে ছড়ানো তৃতীয় ভিডিওটির সাথে ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি-র প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের ছবির মিল পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের শ্রীনগর শহরের একটি মসজিদে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তুলে ধরা হয়(আর্কাইভ লিংক)। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো ক্লিপ(বামে) এবং এনডিটিভির প্রকাশিত ছবির তুলনামূলক স্ক্রিনশট

একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অনুরূপ কিছু ছবি ছাপানো হয়। প্রতিবেদন আনুসারে, আগুনে ভবনটি ভস্মীভূত হলেও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি (আর্কাইভ লিংক)। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

এছাড়া ধর্মীয় স্থাপনাটির ছবির সাথে গুগল ম্যাপের ছবির মিল পাওয়া যায়। 

Image
অসত্য পোস্টের ভিডিও(বাম) এবং গুগল ম্যাপের মধ্যকার মিল এএফপি কর্তৃক হাইলাইট করে তুলনামূলক স্ক্রিনশট

এএফপি এর আগেও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে ঘিরে ছড়ানো অপতথ্য খণ্ডন করেছে।    

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ