এই তরবারিটি নবী মুহাম্মদের জীবনাবসানের কয়েক শত বছর পরে তৈরি হয়েছে

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে একটি ছবি হাজারো বার শেয়ার হয়েছে এবং দাবি করা হচ্ছে ছবিতে দেখা যাওয়া তরবারিটি নবী মুহাম্মদ এর ব্যবহৃত তরবারি। দাবি অসত্য। তরবারিটি ১৫ শতকের শেষের দিকে স্পেনে মুসলিম একটি রাজবংশের শাসনকালে তৈরি করা হয়েছিল, যা সপ্তম শতাব্দীতে নবী মুহাম্মদ এর মৃত্যুর বহু পরের ঘটনা।

২৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে এক ফেসবুক পোস্টে ছবিটির ক্যাপশন লেখা হয়েছে: "আখেরি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তলোয়ার।"

পোস্টটিতে ৫০ হাজারের বেশি ইন্টারেকশন ঘটেছে এবং ১৪০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে।

অসত্য দাবি সহকারে ছবি শেয়ার করা ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশটটি গত ৩০ জানুয়ারি নেয়া

গত ২০ জানুয়ারির আরেকটি ফেসবুক পোস্টে ইংরেজিতে ছবিটির ক্যাপশন দেয়া হয়েছে: "হযরত মুহাম্মদ (তার উপর শান্তি বর্ষিত হোক) এর তরবারি"।

'হযরত' একটি আরবি শব্দ এবং মুসলিম ধর্মীয় সম্মানিত ব্যক্তিদের নামের সাথে সম্মানার্থে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

মুহাম্মদ ইসলামের নবী, যিনি সৌদি আরবে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ এবং ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন বলে ঐতিহাসিকভাবে মনে করা হয়।

ছবিটি একইরকম দাবি সহকারে ফেসবুকে এখানে, এখানে এবং এখানেও পোস্ট করা হয়েছে।

একই তরবারির ছবি আরেকটি দাবি সহকারে এখানেএখানে পোস্ট করা হয়েছে। এসব পোস্টে দাবি করা হয়েছে এটি ১৫৪০ সালের দিকে জন্ম নেয়া ভারতের এক রাজা মহারানা প্রতাপের তরবারি যিনি মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

কিন্তু এসব দাবি অসত্য।

গুগল রিভার্স সার্চ করে ছবিটি এই টুইটে পাওয়া গেছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে এই 'বোয়াব্দিল তরবারি'টি ১৪০০ সালের দিকে তৈরি এবং এটি স্পেনের টলেডো আর্মি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

এএফপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে স্পেনের টলেডো আর্মি মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভ্রান্তিকর ফেসবুক পোস্টের ছবিতে দেখা যাওয়া তরবারিটি তাদের কাছে নয়, বরং প্যারিসে অবস্থিত ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারের মালিকানায় রয়েছে। টলেডো মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে যে, একই ধরনের আরেকটি তরবারি তাদের কাছে সংরক্ষিত থাকলেও ফেসবুকে ভাইরাল ছবিটির তরবারি সংগ্রহে নেই।

"এই তরবারিটি টলেডো আর্মি মিউজিয়ামে নেই। এটি প্যারিসের জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রাচীন জিনিসপত্রের সংগ্রহশালায় আছে, যেখানে প্রাচীন, মধ্যযুগীয় এবং রেনেসাঁ সময়কালের বেশ কিছু মনুমেন্ট সংরক্ষিত রয়েছে", টলেডো আর্মি মিউজিয়ামের একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেছেন।

"বোয়াব্দিল জিনেতা তরবারি এক ধরনের বিশেষ তরবারি। পৃথিবীতে এই প্রকারের মোট ১২টি তরবারি রয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে একমাত্র আমাদের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত তরবারিটি স্বয়ং বোয়াব্দিলের (ব্যবহারে) ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্যারিসে অবস্থিত ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগার Bibliothèque nationale de France (BnF) এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন বিভ্রান্তিকর ফেসবুক পোস্টে ছড়ানো ছবির তরবারিটি তাদের প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত আছে।

বিএনএফ'র মুখপাত্র ইলোডি ভিনসেন্ট এএফপিকে বলেছেন, "তরবারিটি লুভর আবুধাবিকে তিন বছরের জন্য ধার দেয়া হয়েছিল এবং গত বছর তারা এটি আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।"

বিএনএফ'র ওয়েবসাইটে তরবারিটি সংক্রান্ত একটি পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, এটি একটি 'বোয়াব্দিল তরবারি', যা প্রাচীন স্পেনের টলেডো শহরে ১৪৮০ সালের দিকে তৈরি করা হয়েছে।

বিএনএফ'র ওয়েবসাইটে তরবারিটির ছবি; গত ৩০ জানুয়ারি স্ক্রিনশটটি নেয়া

মুসলিম নাসরিদ রাজবংশ ১৪৯২ সাল পর্যন্ত আইবেরিয়ান উপদ্বীপ শাসন করেছিল। এরপর ক্যাস্টাইলের ক্যাথলিক রানী ইসাবেলা প্রথমের কাছে সব ভূমি সমর্পণ করতে বাধ্য হন রাজবংশটির শেষ শাসক গ্রানাডার মুহাম্মদ সপ্তম-- যিনি বোয়াব্দিল হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিলেন।

বিএনএফ'র ওয়েবসাইটে ফরাসি ভাষায় তরবারিটির বর্ণনায় লেখা হয়েছে: "এই তরবারিটি সমসাময়িক কালের (নাসরিদ শাসনের) এক গুচ্ছ সমরাস্ত্রের অন্তর্ভূক্ত যেগুলো মূলত স্পেনের বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত আছে এবং এই অস্ত্রগুলো 'বোয়াব্দিল তরবারি' নামে পরিচিত। এই নামকরণ হয়েছে খ্রিষ্টানদের পুনর্বিজয়ের আগে ১৫ শতকের শেষের দিকে গ্রানাডার সর্বশেষ মুসলিম শাসকের নামানুসারে।"

"মুসলিম শাসকরা তাদের নিয়োগকৃত প্রশাসকদের তরবারি দিয়ে সম্মানিত করতেন। ব্যক্তির পদমর্যাদার উপর ভিত্তি করে তরবারির অলংকরণের ভিন্নতা থাকতো।"

ওয়েবসাইটের বর্ণনা মতে, তরবারিটির মূলত ব্লেড ১৬ শতাব্দিতে জার্মানিতে পরিবর্তন করা হয়েছিল।

নীচে বিভ্রান্তিকর ফেসবুক পোস্ট (বামে) এবং বিএনএফ'র ওয়েবসাইটে দেয়া তরবারির ছবির (ডানে) তুলনামূলক স্ক্রিনশট দেয়া হল:

বিভ্রান্তিকর ফেসবুক পোস্টে ব্যবহৃত ছবি (বামে) ও বিএনএফ'র ওয়েবসাইটে দেয়া তরবারির ছবির (ডানে) তুলনামূলক চিত্র

তরবারিটিতে আরবিতে লেখা রয়েছে "একমাত্র আল্লাহই বিজয়ী", যা ছিল নাসরিদ রাজবংশের ঘোষিত নীতিবাক্য।