গরম পানি পান করলে '৯ মাসে সব ধরনের ক্যান্সার নিরাময়' হয় না

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

বহু হাজার বার শেয়ার হওয়া একটি ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, 'গরম পানি পান করলে বহু ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা, এমনকি সব ধরনের ক্যান্সার ভালো হয়ে যায়'। দুজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এএফপি'কে বলেছেন এ ধরনের তত্ত্ব 'হাস্যকর' ও 'ভুয়া'।

গত ১৭ জানুয়ারি একজন নারীর ছবিসহ এরকম ফেসবুক পোস্ট এখানে শেয়ার করা হয়েছে।

( Qadaruddin SHISHIR)

বাংলা পোস্টটিতে বলা হয়েছে: "একদল জাপানি চিকিৎসক নিশ্চিত করেছেন যে কয়েকটি স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধানে গরম পানি ১০০% কার্যকর"।

এরপর ১৭টি রোগ বা শারিরীক অবস্থার তালিকা দেয়া হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে, মাইগ্রেন, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি নিম্ন রক্তচাপ।

পোস্টটিতে আরও বলা হয়েছে: "গরম পানি থেরাপি যুক্তি সঙ্গত সময়ের মধ্যে যে সমস্ত স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির সমাধান করবে, নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো:- ৩০ দিনের মধ্যে ডায়াবেটিস, ৩০ দিনের মধ্যে রক্তচাপ, ১০ দিনের মধ্যে পেটের সমস্যা, ০৯ মাসের মধ্যে সমস্ত ধরণের ক্যান্সার...।"

"কীভাবে গরম পানি পান করবেন?" উপশিরোনামে ফেসবুক পোস্টটিতে লেখা হয়েছে: "নিয়মিত রাত ১০-১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে  খালি পেটে প্রায় ২ গ্লাস গরম পানি পান করতে হবে, প্রথম দিকে ২ গ্লাস পানি পান করতে সক্ষম নাও হতে পারে কেউ তবে আস্তে আস্তে এটি করতে পারবে।"

সবশেষে বলা হয়েছে উপরিউক্ত তথ্য "জাপানি ডাঃ মেনসাহ-আসরে হতে" সংগ্রহ করা হয়েছে।

একইরকম পোস্ট ফেসবুকে বাংলায় এখানে, এখানেএখানে শেয়ার করা হয়েছে। ইংরেজিতেও এমন পোস্ট করা হয়েছিল বিগত বছরগুলোতে।

কিন্তু পোস্টের দাবিগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই- বলছেন একাধিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ।

ভিত্তিহীন দাবি

জনস্বাস্থ্যের একজন অধ্যাপক এএফপি'কে বলেছেন, পানি গরম বা ঠাণ্ডা হোক তার কোনো 'রোগ সারানোর ক্ষমতা নেই'।

"পানি জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অবশ্যই রোগ সারিয়ে তোলার কোনো ক্ষমতা এটির নেই", বলেছেন প্যারিস স্যাকলে ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্যের অধ্যাপক ও ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসার্ম এর সেন্টার ফর রিসার্চ ইন এপিডেমিওলোজি এন্ড পপুলেশন হেলথ এর পরিচালক ব্রুনো ফ্যালিসার্ড।

তিনি আরও বলেন, "পানি গরম হোক বা ঠাণ্ডা সেটা কোনো ব্যাপার না। এটিতে রোগ সারানোর ক্ষমতা নাই আবার এটি ক্ষতিকরও না। শূন্য থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রার পানি মানবশরীর সহ্য করতে পারে।"

"রোগ সারাতে গরম পানির এমন উপকারিতা বর্ণনা করে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই। এবং গরম পানির এমন থেরাপির পেছনের যে যুক্তি তাও হাস্যকর", বলে অভিহিত করেছেন ব্রুনো।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ইউসিএফ কলেজ অব মেডিসিনি এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. রুমি আহমেদ খান এ বিষয়ে এএফপি'কে বলেছেন, "ঠাণ্ডা পানি বা বরফের চেয়ে গরম পানি কোনো দিক থেকে বেশি উপকারি এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শ্বাসনালীতে ঠাণ্ডা এলার্জি বা ভাইরাস জনিত কোনো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময় কুসুম গরম পানিতে আরামবোধ করতে পারেন এবং এর পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তিও থাকতে পারে।"

"তবে ভাইরাল হওয়া পোস্টে (গরম পানির উপকারিতা বিষয়ে) যেসব দাবি করা হয়েছে সেগুলো ভুয়া অথবা এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই", বলেন তিনি।

গরম পানির মাধ্যমে ৯ মাসে ক্যান্সার বা ১০ দিনে জরায়ু সংক্রান্ত রোগসহ আরও যেসব রোগ নিরাময়ের কথা ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে সেগুলোকে "সম্পূর্ণ ক্ষতিকর মিথ্যাচার এবং ভুয়া তথ্য" হিসেবে অভিহিত করেছেন ডা. রুমি।

 রহস্যময় চিকিৎসক

ভাইরাল ফেসবুক পোস্টে 'গরম পানি থেরাপি'র সূত্র হিসেবে "জাপানি ডাঃ মেনসাহ-আসরে" নামক একজন চিকিৎসকের বরাত ব্যবহার করা হয়েছে। একইসাথে পোস্টের শুরুতে বলা হয়েছে: "একদল জাপানি চিকিৎসক নিশ্চিত করেছেন"। ইংরেজি ভাষার ভাইরাল পোস্টগুলোতে কথিত জাপানি ডাক্তারের নামের বানান উল্লেখ করা হয়েছে Dr D. Mensah Asare.

কিন্তু এএফপি এই নামে গুগলে সার্চ করে কোনো সত্যিকারের চিকিৎসকের সন্ধান পায়নি। অথবা 'একদল জাপানি চিকিৎসকের' বরাতেও নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র থেকে গরম পানির সংক্রান্ত উল্লিখিত কোনো তত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

গুগলের সার্চ ফলাফলে একটি ব্লগের লিংক আসে যেখানে গরম পানির দ্বারা স্বাস্থ্য সমস্যার শতভাগ কার্যকরী সমাধানের কথা বলা হয়েছে।  কিন্তু ব্লগটিতে যেই ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তিনি Dr D. Mensah Asare নামের কেউ নন। বরং এই ব্যক্তির নাম 'আসারে আকুফো', যিনি হলেন ঘানার একজন উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী