বিভিন্ন দেশের ভূমিকম্পের ছবিকে বাংলাদেশের ভূমিকম্পের চিত্র হিসেবে বিভ্রান্তিকরভাবে প্রচার

২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত কিছু ভবনের ছবি সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে ছড়িয়ে সেগুলোকে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র হিসেবে অসত্যভাবে দাবি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ভবনগুলো ২০১৫ সালের এপ্রিলে নেপালে, ২০২১ সালের আগস্টে হাইতিতে এবং ২০২৫ সালের মার্চে মিয়ানমারে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্পের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ওই সময়কার সংবাদ প্রতিবেদনে ভবনগুলোর ছবি দেখা যায়।  

বাংলাদেশে ৫ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে ছড়ানো একটি ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, “ভূমিকম্পে উত্তর বাড্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন।”   

তিন হাজার ২০০ বারেরও বেশি শেয়ার হওয়া ছবিতে আংশিকভাবে ধ্বসে পড়া একটি ভবন দেখা যায়।

একই দিনে শেয়ার করা অনুরূপ আরেকটি ফেসবুক পোস্টে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ভবনের ওপর থেকে নেয়া দৃশ্য দেখা যায়। ছবিটি ভূমিকম্পের পর ঢাকায় তোলা বলে ক্যাপশনে দাবি করা হয়। 

ওই দিন অন্য একটি ফেসবুক পোস্টে ক্ষতিগ্রস্ত আরও ভবনের ছবি শেয়ার করা হয়।  এসব ছবির ক্যাপশনে বলা হয়, “আজকের ভূমিকম্পে গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি পোশাক কারখানার ভবন ধ্বসে পড়েছে। এতে কয়েকশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন এবং অনেক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন।”

Image
এএফপির যোগ করা লাল ক্রস চিহ্নসহ ২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নেয়া অসত্য পোস্টের স্ক্রিনশট

২১ নভেম্বর ভূমিকম্পের পর একই ছবি ফেসবুকে এবং এক্স পোস্টে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে শেয়ার করা হয়। ওই দিন ভূমিকম্পে কমপক্ষে ১০ জন নিহত এবং ৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়।

পরের দিন ২২ নভেম্বর দুটি ছোট ছোট ভূমিকম্প আঘাত হানলে দেশজুড়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

ভূমিকম্পে অন্তত ১৪টি ভবন এবং একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাসহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও, অনলাইনে ছড়ানো ছবিগুলো এসব ক্ষয়ক্ষতির নয়।  

প্রকৃতপক্ষে ছবিগুলো বিভিন্ন দেশে ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতির।  

হাইতি

গুগলে রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায় যে, প্রথম ছবিটি হাইতিতে ৭ দশমিক ২ মাত্রার এক মারাত্মক ভূমিকম্পের বিষয়ে আল জাজিরার ১৪ আগস্ট ২০২১ তারিখের একটি প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই ভূমিকম্পে হাইতিতে অনেক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল (আর্কাইভ লিংক)।

হাইতির একটি শহরের প্রতি ইঙ্গিত করে ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়, “লেস কেয়েসে ৭ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন।”

ছবিটিতে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে কৃতিত্ব দেয়া হয় এবং সংবাদ সংস্থা রয়টার্সও একই ছবি প্রকাশ করেছে(আর্কাইভ লিংক)। ভিন্ন কোণ থেকে তোলা ভবনটির আরেকটি ছবিও প্রকাশ করেছে একটি(আর্কাইভ লিংক)। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো পোস্টের(বামে) এবং এপি-র প্রকাশিত ছবির তুলনামূলক স্ক্রিনশট

হাইতির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ১৪ আগস্টের ভূমিকম্পে ২,০০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এছাড়া ৬০০,০০০ মানুষকে প্রভাবিত করেছে (আর্কাইভ লিংক)। 

নেপাল 

পৃথক একটি রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, দ্বিতীয় ছবিটি ৩০ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে একটি ভেরিফাইড স্টোরিফুল চ্যানেলের ইউটিউব ভিডিওর থাম্বনেইলে প্রকাশিত হয়। ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়, “ড্রোন ফুটেজ ফলোয়িং নেপাল ভূমিকম্প”(আর্কাইভ লিংক)।

নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রতিবেদনে গার্ডিয়ান পত্রিকা একই দিনে একই ভবনের একটি ছবি প্রকাশ করে(আর্কাইভ লিংক)। ভূমিকম্পে প্রায় ৯,০০০ মানুষ নিহত হয় এবং কয়েক লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো পোস্টের (বামে) এবং ২০১৫ সালের এপ্রিলে ইউটিউবে প্রকাশিত ভিডিওর তুলনামূলক স্ক্রিনশট

মিয়ানমার

তৃতীয় ছবিটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মানাটেলেগুতে পাওয়া যায়। ২৯ মার্চ ২০২৫ তারিখে “মিয়ানমার ভূমিকম্প সংকট” শিরোনামের একটি প্রতিবেদনে পত্রিকাটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দুইটির একটি কোলাজ ব্যবহার করে(আর্কাইভ লিংক)। 

৭ দশমিক ৭ মাত্রার ওই ভূমিকম্পে প্রায় ৩,৮০০ জন নিহত হন এবং বহু ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায় (আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)। 

Image
অসত্যভাবে ছড়ানো পোস্টের (বামে) এবং মানাটেলেগুতে প্রকাশিত কোলাজ ছবির তুলনামূলক স্ক্রিনশট

ছবিগুলো আলাদাভাবে ২৮ মার্চ দ্য গুয়াহাটি টাইমসের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও পোস্ট করা হয়েছিল(আর্কাইভ লিংক)।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ভিন্ন কোণ থেকে ভবনগুলোর ছবি ধারণ করেছে। ভবনগুলো কেন্দ্রীয় শহর মান্দালয়ে অবস্থিত বলে তাদের ছবির ক্যাপশনে বলা হয়েছে(আর্কাইভ লিংক এখানে এবং এখানে)।

এএফপি এর আগেও বিভ্রান্তিকরভাবে ছড়ানো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুরনো ছবি এবং ভিডিও খণ্ডন করেছে। 

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ