এটি মিশরীয়দের দ্বারা ফিলিস্তিনিদেরকে পানি সরবরাহের ভিডিও নয়

  • নিবন্ধটি এক বছর পুরনো
  • প্রকাশিত 4 জানুয়ারি 2024, 14:32
  • 6 এক্স মিনিটে পড়ুন
  • লেখক: এএফপি বাংলাদেশ
গত অক্টোবরে ইসরায়েলের উপর হামাস মিলিট্যান্টদের নজিরবিহীন হামলার মাধ্যমে গাজা উপত্যকায় শুরু হওয়া সর্বশেষ যুদ্ধের ছবিতে সামাজিক মাধ্যম সয়লাব হয়ে গেছে। তবে অনলাইনে ছড়ানো এসব ছবি ও ভিডিওর মধ্যে কিছু কিছু বিভ্রান্তিকর অথবা অপ্রাসঙ্গিক। সহায়তা সরবরাহের জন্য মিশরীয়রা মরুভূমি অতিক্রম করে  ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছে এমন দাবি সহকারে ছড়ানো একটি ভিডিও তেমনই এক উদাহরণ। কিন্তু দাবিটি অসত্য: ভিডিওটি গাজায় চলমান যুদ্ধের আগের এবং এতে মূলত লিবিয়ার সাথে লাগোয়া মিশরীয় সীমান্ত দিয়ে সিগারেট চোরাকারবারের দৃশ্য দেখানো হয়েছে।

গত ১৫ অক্টোবর ফেসবুকে এখানে আপলোড করা একটি ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়: "#মিশরীয় জনগণ রাফা বর্ডার ক্রসিংয়ে জড়ো হওয়া হাজার হাজার নিপীড়িত #ফিলিস্তিনিদের জন্যে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতে দলে দলে বর্ডারের দিকে ছুটছে।"

৭,৪০০ বারের বেশি ভিউ হওয়া ১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে শত শত লোককে একটি মরুভূমি জুড়ো পিঠে 'মেকশিফট ব্যাকপ্যাক' মতো ব্যাগ বহন করতে দেখা যায়।

Image

ভিডিওটি একই দাবিতে ফেসবুকে এখানে এখানে শেয়ার করা হয়। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ভিডিওটি ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায়ও ছড়ানো হয়।

গত ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলে অতর্কিত হামলা চালায় হামাস মিলিট্যান্টরা। হামাসের ওই হামায় বেসামরিক লোকসহ ১,২০০ নিহত হন এবং আরও ২৪০ জনকে জিম্মি করা হয় বলে জানিয়েছে ইসরায়েল কর্তৃপক্ষ।

জবাবে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় আকাশ ও স্থল পথে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলের হামলায় ওই অঞ্চলটি ধ্বংস্তুপে পরিণত হয় এবং বেসামরিক লোকসহ প্রায় ১৭,৫০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয় বলে জানিয়েছে হামাস কর্মকর্তারা।

বিমান হামলায় গাজার বড় একটি অংশ মাটির সাথে মিশে গেছে এবং ন্যূনতম খাবার, পানি এবং জ্বালানির অনুমতি রেখে পুরো এলাকাটিকে অবরোধ করে রেখেছে ইসরায়েল।

গাজায় প্রবেশের সব রাস্তা অবরোধ করে রাখার কারণে মিশরীয় দিকে থেকে গাজায় প্রবেশের একমাত্র পথ রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংয়ে ভিড় করে আন্তর্জাতিক সাহায্যবহনকারী যানবাহনের বহর।

তবে ফিলিস্তিনিদেরকে সাহায্য সরবরাহের জন্য মিশরীয়রা ফিলিস্তিনে ঢুকছেন দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওটি অসত্য।

সিগারেট ব্র্যান্ড ক্লুস/সংকেত

বিভ্রান্তিকর দাবিতে ছড়ানো পোস্টের কীফ্রেম বিশ্লেষণে ভিডিও যাচাইয়ের ট্যুল InVID-WeVerify ব্যবহার করে এএফপি দেখেছে যে, ভিডিওটি গত ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে ঢুকে আক্রমণের অন্তত এক মাস আগে থেকেই অনলাইনে ছিল।

একজন 'এক্স' (সাবেক টুইটার), ব্যবহারকারী গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে ক্লিপটি আপলোড করেন (আর্কাইভ এখানে)। পোস্টের ক্যাপশন দেখে বোঝা যায় যে, এটি মিশর-লিবিয়া সীমান্তে ধারণ করা হয়।

কিছু অনলাইন ব্যবহারকারী তাদের মন্তব্যে জানান, ভিডিওটিতে সিগারেট চোরাচালানিদের দেখা যাচ্ছে।

টিকটকে 'ইজিপশিয়ান প্যালেস্ট্যানিয়ানস' নামে কীওয়ার্ড সার্চে মিশরীয় সাহায্যের দাবিতে অক্টোবরে বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত একাধিক ভিডিও পাওয়া যায় (আর্কাইভ এখানে, এখানে এবং এখানে)।

Image

বিভ্রান্তিকর পোস্টে যে লোকেশন দেখানো হয়েছে, এসব ভিডিওতেও একই লোকেশন দেখা গেছে।

এসব টিকটক ক্লিপের মধ্যে গত ১৪ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত এই ভিডিওতে এক লোককে তাদের বহন করা ব্যাগ থেকে লাল ডিজাইনসহ একটি বড় সাদা বাক্স বের করতে দেখা যায়।

Image

ফুটেজের ১২ সেকেন্ডে 'এইচ' এবং 'পি' অক্ষর লেখা বাক্সগুলোকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

'এইচপি সিগারেট' নামে কীওয়ার্ড সার্চে সিঙ্গাপুরের ই-কমার্স ওয়েবসাইট লাজাডাতে একটি সিগারেট ব্যান্ডের ছবি খুঁজে পাওয়া যায়(আর্কাইভ এখানে)। সিগারেটটিকে  'এইচপি রেড আমেরিকান ব্লেন্ড' হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

Image

ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চে এইচ এ্যান্ড পি নামে একটি ফেসবুক পেইজ খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে এটাকে একটি টোবাকো কোম্পানি হিসেবে বর্ণনা করা হয় (আর্কাইভ এখানে)।

ব্যাকপ্যাক শিলালিপি

গত ১৪ অক্টোবর, ২০২৩  স্প্যানিশ ভাষায় অন্য একটি টিকটক ভিডিও বিভ্রান্তিকর দাবিটি শেয়ার করে। ভিডিওটির ক্যাপশনের অনুবাদ হচ্ছে: "গাজার লোকদেরকে খাদ্য ও পানি সরবরাহের জন্য মিশরীয়রা ফিলিস্তিন ভূখন্ডে ঢুকছে। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুক।"

ফুটেজে লোকজনকে আরবি লেখা সহ বড় সাদা ব্যাগ বহন করতে দেখা যায়।

গুগল লেন্স ট্যুলের সাহায্যে ব্যাগের আরবি শব্দগুলোর অনুবাদে “কাদৌরাহ” এবং “আবু সামলেহ” পাওয়া যায়, যেগুলোর কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। এই দুই শব্দের মাঝের শব্দটি হল "৭১৭" নম্বর। এএফপির আরবি ভাষা-ভাষী সাংবাদিকরা এটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

Image

আরবি শিলালিপি ছাড়াও, ব্যাগের কাপড়ের ভিতর তিনটি গাঢ় স্ট্রাইপে তৈরি বৃত্তাকার ডিজাইনে "ও", "আর", "আই" এবং "এস" অক্ষর দেখা যায়।

'ওরিস সিগারেট' লিখে কীওয়ার্ড সার্চে একটি সিগারেট ব্র্যান্ডের ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে একই নাম এবং ব্যাকপ্যাকের ভিতর দৃশ্যমান একই লোগো দেখা যায় (আর্কাইভ এখানে)।

'ওরিস সিগারেট কান্ট্রি' নামে অন্য একটি কীওয়ার্ড সার্চে বিজনেস-টু-বিজনেস নিউজ সাইট মুডি ডেভিট রিপোর্ট-র প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায় (আর্কাইভ এখানে)। প্রতিবেদনে ওরিয়েন্টাল জেনারেল ট্রেডিংকে সিগারেট ব্র্যান্ডের নির্মাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

'ওরিয়েন্টাল জেনারেল ট্রেডিং' নামে অনুসন্ধানে কোম্পানির  ওয়েবসাইট খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয় যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি 'উৎপাদক, ব্র্যান্ড ওনার, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ট্রাভেল রিটেইলার (আর্কাইভ এখানে)।"

লোগোটির সাথে ব্যাগের কাপড়ের ভিতর দৃশ্যমান লোগোটির সাথে সম্পূর্ণ মিল রয়েছে।

মিশর-লিবিয়া বর্ডার

আরবি ভাষায় 'লিবিয়া-মিশর চোরাচালান এলাকা' নামে কীওয়ার্ড সার্চে ২০২২ সালের ১৬ জুন ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায় (আর্কাইভ এখানে)।

এতে একটি মরুভূমিতে আয়তক্ষেত্রাকার ব্যাগসহ লোকজনকে দেখা যায়, যেমনটি বিভ্রান্তিকর দাবিতে ছড়ানো পোস্টে দেখা গেছে।

ভিডিওটির আরবি ভাষার ক্যাপশনে বলা হয়: "মিশরীয় চোরাকারবারীরা লিবিয়া-মিশরীয় সীমান্ত অতিক্রম করে অজানা নিষিদ্ধ পণ্য পাচার করছে। দুই দেশের সীমান্তে শিথিল নিরাপত্তার সুযোগ নিয়ে তারা তাদের খুশি মতো চলাফেরা করে।"

একই কীওয়ার্ড সার্চ ২০২২ সালের ১৩ জুন  একটি ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা একটি ভিডিও খুঁজে পায় (আর্কাইভ এখানে)। এতে এক দল লোককে একই রকম সাদা মেকশিফট ব্যাকপ্যাক নিয়ে দূসঢ় জমির মাঝ দিয়ে হাঁটছে যা বিভ্রান্তিকর ক্লিপগুলিতে দৃশ্যমান ল্যান্ডস্কেপের মতো।

Image

 

আরবি ভাষার ক্যাপশনের ব্যাখ্যায় বলা হয় যে, এটি "মিশর, লিবিয়া এবং সাল্লুমের সীমান্তে চোরাচালান।"

নিউজ কন্টেন্ট প্রচারকারী মিশর ভিত্তিক অন্য একটি ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওতে সাল্লুম নামে একই স্থানে সিগারেট চোরাচালানিদের দেখা যায় (আর্কাইভ এখানে)।

Image

গুগল ম্যাপে 'সাল্লুম' নামে কীওয়ার্ড সার্চ করে দেখা যায় যে এটি মিশর-লিবিয়া সীমান্তের কাছে একটি উপকূলীয় শহর।

মানচিত্র অনুযায়ী এটি ভূমধ্যসাগর এবং একটি মরুভূমির মধ্যেবর্তী স্থান।

ফুটেজটি সাল্লুম-এ ধারণ করা হয়েছিলো কিনা সে বিষয়ে জানার জন্য আমরা ফেসবুকে বিভ্রান্তিকর দাবিতে ছড়ানো ক্লিপটির কিছু ভিজ্যুয়াল সূত্র অনুসন্ধান করি। ভিডিওর চার সেকেন্ডে বিস্তৃর্ণ মাঠের শেষ প্রান্তে আমরা বাঁকা ছাদসহ একটি ভবন চিহ্নিত করি।

গুগল ম্যাপে সাল্লুম এবং মিশর-লিবিয়া এলাকার বিষয় আরো অধিকতর অনুসন্ধানে সীমান্ত পোস্টে একটি ভবন খুঁজে পাওয়া যায়, যা বিভ্রান্তিকর ভিডিওতে সনাক্ত করা ভবনের বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে যায়।

Image

সীমান্ত পোস্টের ভবনটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ফেসবুকে মিশরের মন্ত্রী পরিষদের তথ্য ও সিদ্ধান্ত সহায়তা কেন্দ্রের আপলোড করার ভিডিওতেও দৃশ্যমান (আর্কাইভ এখানে)।

নিচে গুগল ম্যাপে বাঁকা ছাদসহ ভবনের ছবি (বামে) এবং ফেসবুক ভিডিওতে দৃশ্যমান ভবনের তুলনামূলক স্ক্রিনশট দেয়া হল:

Image

ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত অনলাইনে ভুল তথ্যের একটি জোয়ার তৈরি করেছে। এসব ভুল তথ্য খণ্ডন করে এএফপির করা প্রতিবেদন দেখুন এখানে

এমন কোনো কন্টেন্ট আছে যা আপনি এএফপি’কে দিয়ে ফ্যাক্ট চেক করাতে চান?

আমাদের সাথে যোগাযোগ