এটি ইরানের হিজাববিরোধী আন্দোলনের নয়, বেলজিয়ান এক শিল্পীর ২০১৪ সালে তৈরি শিল্পকর্মের ছবি

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

ফেসবুকে চুলসদৃশ বস্তু দিয়ে তৈরি একটি পতাকার ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে এটি গত সেপ্টেম্বরে ইরানে হিজাব বিরোধী আন্দোলনের সময় নারীদের প্রতিবাদের ছবি। দাবিটি অসত্য। ছবিটি ২০১৪ সালে বেলজিয়ামের এক শিল্পীর তৈরি শিল্পকর্মের ভিডিও থেকে নেয়া একটি স্থিরচিত্র। এক সাক্ষাৎকারে এই শিল্পী জানান যে, এটি ফ্রেঞ্চ ক্যারিবিয়ান দ্বীপ মার্টিনিকের ঔপনিবেশিক অতীত তুলে ধরার জন্য তিনি এটি তৈরি করেন।

গত ২২ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে এখানে ছবিটি শেয়ার করা হয়।

পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, “মাথার চুল কেটে পতাকা বানিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে টাঙ্গিয়ে দিচ্ছে ইরানে হিজাবের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত হাজার হাজার নারী। পুলিশ এ পর্যন্ত ৯ জন নারীকে প্রকাশ্যে হত্যা করেছে রাজপথে।”

“এতে ভীত তো হচ্ছেই না, উল্টো হাজারে হাজারে দলে দলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে নারীরা। ইন্সটাগ্রাম সহ বেশ কিছু সামাজিক মাধ্যম ব্লক করে দেয়া হয়েছে। নারীরা V/PN ব্যবহার করে জমায়েত হচ্ছে রাজপথ কাঁপিয়ে।”

( Mohammad MAZED)

গত ১৬ সেপ্টেম্বর ইরানে ‘যথাযথভাবে হিজাব না পরার অপরাধে’ পুলিশের হাতে আটক মাহসা আমিনী নামক ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি মৃত্যুবরণ করলে দেশটিতে তিন বছরের মধ্যে সর্ববৃহৎ আন্দোলন শুরু হয় যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী থেকে শুরু করে স্কুল ছাত্রী পর্যন্ত সব বয়সের নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আন্দোলনরত নারীরা বাধ্যতামূলক হিজাব পরিধান না করে বরং হিজাব পুড়িয়ে ও মাথার চুল কেটে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এই আন্দোলনে শিশুসহ অন্তত ১০৮ জন মৃত্যুবরণ করেছেন বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

ছবিটি একইরকম দাবি সহকারে ফেসবুক এখানে এখানে শেয়ার করা হয়।

নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকেও ছবিটিকে ইরানের বলে টুইট করা হয়।

তবে দাবিটি অসত্য।

গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায় ছবিটি ২০১৪ সালের বেলজিয়ামের ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট এডিথ ডেকিন্ট এর ‘আদিবাসি ছায়া’ শীর্ষক ভিডিও থেকে নেওয়া।

ছবিটি ২০১৬ সালে ডেকিন্ট এর একটি প্রদর্শনী উপলক্ষে ব্রাসেলসের উইয়েলস কনটেম্পরারি আর্ট সেন্টারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

ছবিটির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, “এডিথ ডেকিন্ট, আদিবাসী ছায়া দ্বিতীয় ভাগ, মার্টিনিক দ্বীপ, ২০১৪।”

প্রদর্শনীর ক্যাটালগের ৩১ নং পৃষ্ঠায় শিল্পকর্মটির বর্ণনায় লেখা রয়েছে, “মার্টিনিকের দায়মান্ত উপকূলে মাটিতে আটকে থাকা এবং পাহাড়ের চূড়ায় ছবি তোলা চুলের তৈরি একটি পতাকা। ১৮৩০ সালের ৮ এপ্রিল এই জায়গাতেই একটি গোপন নৌযান শতাধিক আফ্রিকান বন্দী নিয়ে আসে এবং পরবর্তীতে নৌযানটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়া হয়।”

ক্যারিবিয়ান দ্বীপ মার্টিনিক ফ্রান্সের অধীন একটি অঞ্চল এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি দাসদের নিয়ে আসা জাহাজ নোঙ্গর করার স্থান

২০২০ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেকিন্ট বলেন, এই শিল্পকর্মটি লেখক ও দার্শনিক ইডুয়ার্ড গ্লিস্যান্টের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তৈরি করেছেন। ইডুয়ার্ড ফ্রেঞ্চ ক্যারিবিয়ানের ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করা অন্যতম একজন এবং তার লেখায় ঔপনিবেশিকতা, দাসত্ব, বর্ণবাদ এবং সাংস্কৃতিক বৈসাদৃশ্য গুরুত্ব পেয়েছে।

নীচে বিভ্রান্তিকর পোস্টের ছবি (বামে) ও ডেকিন্টের শিল্পকর্মের মূল ছবির (ডানে) একটি তুলনামূলক স্ক্রিনশট দেওয়া হলো:

ডেকিন্টের ভিডিও ২০১৬ সালে উইয়েলসে অনুষ্ঠিত তার প্রদর্শনীর এই ফুটেজে পাওয়া যায়।

ডেকিন্টের প্রতিনিধি ব্রাসেলসের এক আর্ট গ্যালারি ‘গ্যালারি গ্রেটা মির্ট’ এর একজন মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন এই ছবিটি ইরানের আন্দোলনের নয়।

মাগালি উইন্স এএফপিকে বলেন, “এটি ২০১৪ সালে তৈরি ‘আদিবাসী ছায়া দ্বিতীয় ভাগ’ শীর্ষক ভিডিও থেকে নেওয়া, এটি কোন ছবি নয়।”