( AFP / CHRIS DELMAS)

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতির আত্মজীবনী গ্রন্থের বরাতে ভুয়া উদ্ধৃতি ফেসবুকে প্রচার

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের লেখা ইংরেজি ভাষার একটি বইয়ের বরাতে কথিত একটি উদ্ধৃতি বাংলা ভাষায় ফেসবুকে শত শতবার শেয়ার করা হয়েছে। কথিত উদ্ধৃতিতে দেখা যাচ্ছে, বইয়ের লেখক বলেছেন সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তাকে (সায়েম) বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। যদিও বইটিতে জিয়া সম্পর্কে, যিনি ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সালে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ শাসন করেছেন, বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে, কিন্তু এএফপি যাচাই করে দেখেছে ফেসবুকে শেয়ার করা উদ্ধৃতিটি বইয়ে নেই। বইটির বাংলা অনুবাদকারী একজন খ্যাতনামা সাংবাদিকও এএফপিকে বলেছেন, ফেসবুকে ছড়ানো উদ্ধৃতিটি বানোয়াট।

কথিত উদ্ধৃতিটি গত ২৮ মে ২০২২ তারিখে ফেসবুকে এখানে পোস্ট করা হয়েছে।

পোস্টের সাথে এনিমেশন করা একটি ভিডিও সংযুক্ত আছে যেখানে মূলত ক্যাপশনে উল্লেখ টেক্সটকেই বাংলা ভাষায় ধারাভাষ্য আকারে বর্ণনা করা হয়েছে।

( Qadaruddin SHISHIR)

ফেসবুক পোস্টটিতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ১৯৯৭ সালে প্রয়াত আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের আত্মজীবনীমূলক বইয়ের বরাতে একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়েছে যেখানে সায়েম তার উত্তরসুরী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কর্তৃক তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন।

পোস্টটিতে দাবি করা হয়েছে যে, সায়েম তার 'অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ' বইয়ে লিখেছেন জিয়া তাকে পদত্যাগে সম্মত করাতে বন্দুক তাক করে ভয় দেখিয়েছিলেন।

পোস্টে দাবি করা হয়েছে সায়েম তার 'অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ' নামক বইয়ে লিখেছেন: "জিয়া বঙ্গভবনে আসতেন মধ্যরাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে, তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা অস্ত্র উঁচিয়ে রাখতো।"

"আমি প্রায়ই মনে করতাম এটাই বোধহয় আমার শেষ রাত। সংবিধানের ৪ টি মূল স্তম্ভ বাতিল সংক্রান্ত একটি সামরিক ফরমান আমার কাছে স্বাক্ষরের জন্য আসে। আমি ঐ ফরমানে স্বাক্ষর না করে, তা রেখে দেই।"

কথিত উদ্ধৃতিতে আরও বলা হয়েছে: "পরদিন রাত ১১টায় বুটের শব্দে আমার ঘুম ভাঙে। সেনাপ্রধান জিয়া অস্ত্রশস্ত্রসহ বঙ্গভবনে আমার শয়নকক্ষে প্রবেশ করেন।"

"জিয়াউর রহমান আমার বিছানায় তাঁর বুটসহ পা তুলে দিয়ে বলেন, সাইন ইট। তাঁর একহাতে ছিল স্টিক, অন্য হাতে রিভলভার। আমি কাগজটা পড়লাম। আমার পদত্যাগপত্র। যাতে লেখা- ‘অসুস্থতার কারণে আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।"

"আমি জিয়াউর রহমানের দিকে তাকালাম। ততক্ষণে আট দশজন অস্ত্রধারী আমার বিছানার চারপাশে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়া আবার আমার বিছানায় পা তুলে আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে বললেন, ‘সাইন ইট’। আমি কোনোমতে সই করে বাঁচলাম।"

ক্ষমতায় থাকাবস্থায় ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-- যেটি 'বিএনপি' নামে বেশি পরিচিতি-- প্রতিষ্ঠা করেন।

দলটিকে বর্তমানে তার বিধবা স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তারা ২০০৯ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী দলে রয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বেশ আগে থেকে অভিযোগ করে আসছেন যে, জিয়াউর রহমান তার পিতাকে হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এ সংক্রান্ত এএফপির প্রতিবেদন পড়ুন এখানে

ফেসবুক পোস্টটিতে সায়েমের বইয়ের উদ্ধৃতি হিসেবে আরও লেখা হয়েছে: "আমি কোনমতে সাইন করে জীবন বাঁচালাম" - এই কথাটি রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম এর। তাঁর লেখা ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ’ বই থেকে অনেক অজানা ইতিহাস জানা যায় যা দীর্ঘদিন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল বিএনপি।"

"বইটি থেকে আরও জানা যায়, রাষ্ট্রপতি সায়েমের একটাই দুঃখ ছিল যে, তিনি বাংলাদেশের নির্বাচন করে জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যেতে পারেননি। তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়া কিভাবে অস্ত্রের মুখে বাংলাদেশের সংবিধানকে অগ্রাহ্য করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিলো তা জানতে পারবেন এই ছোট এনিমেটেড ভিডিও থেকে। জিয়া রাষ্ট্রপতি সায়েম সাহেবকে কথাও দিয়েছিল সে নির্বাচন এর ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সে নির্বাচনে জিয়া সামরিক বাহিনীর প্রধান ও সামরিক আইন প্রশাসক এর পদে থেকে নিজেই নিজেকে হ্যাঁ না ভোট আয়োজন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে, যা জাতির সাথে সত্যিই এক বড় রকমের তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।"

কথিত উদ্ধৃতিটি ফেসবুকে এখানে, এখানে, এখানেএখানে বাংলাদেশ সরকারের কয়েক শীর্ষ ব্যক্তি শেয়ার করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ গত ২৫ মে উদ্ধৃতিটি তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে পোস্ট করার পর সেটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাসহ মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে প্রকাশিত হয়েছে।

কিন্তু মূল বই বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কথিত উদ্ধৃতিটি বানোয়াট।

মূল বইয়ের টেক্সট

At Bangabhaban: Last Phase নামের মূল বইটি ১৯৮৮ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত একটি আত্মজীবনী গ্রন্থ (ভাইরাল হওয়া ফেসবুক পোস্টেও এই তথ্যটি উল্লেখ করা হয়েছে); যেটিতে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বর্ণনা থাকলেও ফেসবুকে ছড়ানো উল্লিখিত উদ্ধৃতিটি সেখানে নেই।

বইটির ৩৯ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে: "১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিশেষ সহযোগীর নেতৃত্বে উপদেষ্টা কাউন্সিলের কতিপয় সিনিয়র সদস্য আমাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার অনুরোধ করেন। তারা বলেন, তারা তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অধীনে কাজ করতে চান। এতে কি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় না যে, এমনকি ক্ষমতাসীন থেকেও বেসামরিক ব্যক্তিগণ সেনাবাহিনীর অধীনে কাজ করতে চান? আমি তখনই সেখানে, যদিও দ্বিধান্বিত অবস্থায়, পদত্যাগে সম্মত হই।"

নীচে আত্মজীবনী গ্রন্থের ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ পৃষ্ঠার ছবি দেয়া হল:

১৯৮৮ সালে প্রকাশিত At Bangabhaban: Last Phase নামক বইয়ের ৩৮ ও ৩৯ পৃষ্ঠা
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত At Bangabhaban: Last Phase নামক বইয়ের ৪০ ও ৪১ পৃষ্ঠা

খ্যাতনামা সাংবাদিক ও লেখক মশিউল আলম ১৯৯৮ সালে বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, "উদ্ধৃতিটি মনগড়া। আমি ইংরেজি থেকে বইটি অনুবাদ করেছি এবং মূল বইয়ে এমন কোন উদ্ধৃতি পাইনি যেমনটি ফেসবুকে ছড়ানো হয়েছে।"

হাক্কানী পাবলিশার্স কর্তৃক ১৯৮৮ সালের প্রকাশিত মূল ইংরেজি সংস্করণ এবং মাওলা ব্রাদার্স কর্তৃক ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত অনুদিত সংস্করণ- উভয়টিই এএফপি দেখেছে এবং সেগুলোতে ফেসবুকে ছড়ানো কথিত উদ্ধৃতিটি পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ক লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এএফপিকে বলেছেন, "সায়েম তার বইয়ে এটা বলেন নি যে, তাকে বন্দুক তাক করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। অন্য কোথাও এমন দাবি করেছেন বলেও পাওয়া যায় না।"

"আর সেনাবাহিনীর জন্য তাকে বন্দুক ভয় দেখিয়ে পদত্যাগ করানোর কোন দরকারও ছিলো না। কারণ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছে সেনাবাহিনী। যাকে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতি বানিয়েছে তাকে পদত্যাগ করাতে সেনাবাহিনীর জন্য মুখে বলেই দেয়াই যথেষ্ট", মনে করেন তিনি।