ছবিগুলো ভারতে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের, 'দিল্লিতে মসজিদে হামলা'র নয়

কপিরাইট এএফপি ২০১৭-২০২২। সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত।

সাদা কাফনের কাপড় পরা অবস্থা মাটিতে শুয়ে থাকা কিছু ব্যক্তির দুটি ছবি বাংলাদেশে ফেসবুকে শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে যে, ছবি দুটি ভারতের 'দিল্লিতে মসজিদে হামলা'র ফলে নিহত ব্যক্তিদের। কিন্তু ছবিগুলোর যুক্ত এই দাবি অসত্য; মূলত ২০২০ সালে নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে ভারতের মহারাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত প্রতীকী প্রতিবাদ সমাবেশের খবরের সাথে সংবাদ প্রতিবেদন ও সামাজিক মাধ্যমে ছবিগুলো প্রকাশিত হয়।

ছবিগুলো গত ২৯ মার্চ ফেসবুকে এখানে শেয়ার করা হয়। 

পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা রয়েছে, “কলিজা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।”

“হে মালিক দিল্লির মসজিদে যেসব হিন্দুরা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে আমার ভাইদের শহীদ করেছে, তুমি শহীদি ভাইদের রক্তের বিনিময়ে ভারতের শাসন ক্ষমতা মুসলমানদের হাতে কবুল করে মোদী সরকারকে ফেরাউনের মতো পতন ঘটিয়ে দাও।”

হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের অধীনে সংখ্যালঘু মুসলমানদের উপর দমন পীড়নের ঘটনা ঘটছে।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে অবমূল্যায়ন করে সংখ্যালঘুদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করার অভিযোগ রয়েছে। 

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটির রাজধানী দিল্লিতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সংঘটিত অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতায় একটি মসজিদে আগুন দেয়ার প্রেক্ষিতে সেসময়ও ছবিগুলো ফেসবুকে শেয়ার করা হয়।

২০১৯ সালে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতের পার্শ্ববর্তী তিনটি দেশ থেকে আসা সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা হয়, তবে মুসলমানদের জন্য এই আইন প্রযোজ্য নয়।

ভারতীয় মুসলিমদের অনেকে মনে করেন, এই আইনের মাধ্যমে জাতীয় নাগরিক পঞ্জির (এনআরসি) পথ সুগম করা হয়েছে যার ফলে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ছবিগুলো ফেসবুকে এখানেএখানে অনুরূপ ক্যাপশন সহকারে শেয়ার করা হয়।

পোস্টটিতে দিল্লির কোন মসজিদ অথবা কবেকার আগুনের ঘটনাকে নির্দেশ করা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়।

তবে পোস্টগুলোর দাবিটি অসত্য।

কাফনের কাপড় পড়ে প্রতিবাদ

গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায় একইরকম ছবি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের মহারাষ্ট্রে আওরঙ্গবাদে নাগরিকত্ব আইনে বিরোধী প্রতিবাদ সমাবেশের একটি খবরের সাথে প্রকাশিত হয়। 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জেজেপি নিউজে ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিবাদ সমাবেশটি রাজধানী দিল্লিতে চলমান আন্দোলনের সমর্থনে ছিল। আন্দোলনকারীরা কাফনের সাদা কাপড় পরে প্রতিবাদে অংশ নেন।  

হিন্দি ভাষার প্রতিবেদনটিতে লেখা রয়েছে, “আওরঙ্গবাদ থেকে আমরা অস্বস্তিকর ছবি পাচ্ছি যেখানে প্রতিবাদকারিরা সিএএ-এনআরসির বিরুদ্ধে কাফনের কাপড় পরে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন।”

জেজপি নিউজের ছবিতে দেখা যায় একজন প্রতিবাদকারির ব্যানারে ‘সিএএ এনআরসি’ লেখা রয়েছে। 

ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বিসমিল আজিমাবাদি এর লেখা 'সারফারশ কি তামান্না' কবিতার কয়েকটি লাইনও প্রতিবাদকারীদের পরন থাকা কাফনের কাপড়ে লেখা রয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবাদ সমাবেশটির একটি ভিডিও ফুটেজ একইদিন ইউটিউবে প্রকাশিত হয়।

ভিডিওটিতে মাইক্রোফোন হাতে একজনকে হিন্দিতে "আমরা আজাদী অর্জন করেই ছাড়বো, আমরা আজাদী চাই" বলতে শোনা যায়। একইসময় অন্যান্যদেরকে ভারত ও পাকিস্তানে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বহুল ব্যবহৃত "আজাদী" বলে শ্লোগান দিতে শোনা যায়।

অন্যদিকে ভিডিও ক্লিপটিতে প্রতিবাদকারীরা যে জীবিত তা স্পষ্টতই দশ্যমান। এখানে অনেকেরই চোখ খোলা দেখা যায়, আবার ক্লিপটির ১২ সেকেন্ডে এক ব্যক্তিকে মাথা তুলতেও দেখা যায়।

এই ছবিগুলো এর আগেও পাকিস্তানের একটি আগুনের ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করে ছড়ানো হয় এবং এএফপি এর উপর এখানে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন করে।