ফ্যাক্ট-চেকিং: আমরা যেভাবে কাজ করি

অনলাইনের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করার জন্য সাংবাদিকতার গতানুগতিক দক্ষতার পাশাপাশি আমরা বিশেষ কিছু টুলসও ব্যবহার করে থাকি। একইসাথে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগাই এবং অত্যধিক সতর্কতার সাথে যাচাইয়ের কাজ করে থাকি।

কোন ভুয়া তথ্য খণ্ডনের ক্ষেত্রে আমরা কি কি ধাপ অনুসরণ করে থাকি তা প্রতিবেদনে স্বচ্ছভাবে দেখানোর চেষ্টা করি।

নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু করার মাধ্যমে আমরা কোনো সন্দেনজনক প্রতিবেদন বা দাবির ব্যাপারে অনুসন্ধান চালাই এবং তা নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করি, যা আমাদের নিজস্ব নিউজওয়্যারে যেতে পারে আবার নাও যেতে পারে।

আমাদের সম্পাদকরা প্রথমে কোনো একটি দাবির মূল উৎস চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। এক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব আর্কাইভ এবং প্রয়োজনে আমাদের নিজস্ব সাংবাদিকদের সাহায্য নিয়ে থাকেন।

আমাদের অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত এরকম তথ্য যোগাড় করার চেষ্টা করি এবং তা অনলাইনে সংরক্ষণ করি।

উৎসের সন্ধান

ভুয়া তথ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুরনো ছবিকে অপ্রাসঙ্গিকভাবে নতুন ঘটনায় যুক্ত করে দিয়ে ছড়ানো।

এক্ষেত্রে আমরা ছবিটিকে বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে আপলোড করে তা এর আগে অনলাইনে ব্যবহার হয়েছে কি না তা জানার জন্য রিভার্স ইমেজ সার্চ করি।  

গুগল ক্রোম ব্রাউজারে কোন ছবিতে রাইট ক্লিক করলে সেখানে "search Google for image" এরকম একটি অপশন আসে। এর মাধ্যমে সার্চ ইঞ্জিনটি তার ডেটাবেজে সংরক্ষিত সকল ছবির সাথে মিলিয়ে দেখে এই ছবিটি কোথাও আছে কি না।

এজন্য সাধারণত আমরা ইনভিড/উইভেরিফাই এক্সটেনশন (নীচ দেখুন) ব্যবহার করি এবং করতে পরামর্শ দেই কারণ এতে কেবল একটি রাইট ক্লিকের মাধ্যমে গুগল, বিং (মাইক্রোসফট), ইয়ানডেক্স (রাশিয়ান), টিনআই, বাইদু এর (চীনা) মতো বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনে কোন ছবির উৎস বের করার সুযোগ পাওয়া যায়।

সবসময় রিভার্স ইমেজ যথাযথ ফলাফল প্রদান করে না, কারণ হয়তো এর আগে ছবিটি ইন্টারনেটে কোথাও প্রকাশিত হয়নি অথবা তা ইনডেক্স করে রাখা হয়নি। আবার অনেক সময় কোন ছবি আংশিক পরিবর্তন করে অথবা উল্টো করে ব্যবহার করার কারণে রিভার্স ইমেজ সার্চে কাঙ্খিত ফলাফল আসে না। উদাহরণস্বরূপ কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে নিয়ে ছড়ানো এই ছবিটির কথা বলা যায়।

এর পাশাপাশি আমরা ছবিতে বা ভিডিওতে বিভিন্ন দৃশ্যমান সূত্র (দোকানের সাইনবোর্ড, রাস্তার নির্দেশনা, স্থাপনা, গাছপালা, গাড়ির নাম্বার প্লেট) ধরেও কোন ছবির অবস্থান অথবা তারিখ যাচাই করার চেষ্টা করি।

গ্রিসের ক্রিটে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দৃশ্যমান সী-বীচের আকৃতি দেখে গুগল ম্যাপের সহায়তায় আমরা ভিডিওটির অবস্থান নির্ণয় করেছিলাম।

কোন বক্তব্যের পক্ষে একটি ছবি অথবা ভিডিও একমাত্র প্রমাণ হতে পারেনা। এজন্য আমরা একটি ছবির সাথে অন্যান্য তথ্য যেমন: ছবিটি প্রকাশের তারিখ, আবহাওয়া পরিস্থিতি ইত্যাদি বর্ণনার সামঞ্জস্য মিলানোর চেষ্টা করি।

কোন সন্দেহজনক ছবি দেখলে তা বিকৃত করা হয়েছে কি না সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমরা ছবিটির মূল ফাইলটি বের করার চেষ্টা করি।

কোন বক্তব্য বা উক্তির উৎস সন্ধান

কোন লেখার একটি প্যারা যেকোন সার্চ ইঞ্জিনে সাধারণভাবে কপি পেস্ট করে দিলেই অনেক সময় জানা যায় যে, অনলাইনে আগে থেকে এটির অস্তিত্ব ছিল কি না।

রাজনীতিবিদদের সম্পর্কিত বিভিন্ন উক্তি প্রায় সময়ই প্যারোডি ওয়েবসাইট থেকে নেয়া হয়। সার্চ ইঞ্জিনে কপি পেস্ট করলে মুহুর্তের মধ্যেই মূল সূত্র পাওয়া সম্ভব।

যখন কোন বক্তব্য কারো নামে ছড়ানো হয় তখন আমরা অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং, অফিসিয়াল ট্রান্সক্রিপ্টের মতো নির্ভরযোগ্য সূত্র খোঁজার চেষ্টা করি। অধিকতর অনুসন্ধানের জন্য আমরা ব্যক্তির অনলাইনে বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে খোঁজার চেষ্টা করি। অনেক সময় বক্তব্যের সত্যাসত্য যাচাইয়ের জন্য সেই ব্যক্তির সাথেও আমরা সরাসরি যোগাযোগ করি।

মাত্রাগত/পরিমাণগত/সংখ্যাগত উপাত্ত যাচাইয়ের সময় আমরা মূল গবেষণাপত্রটি এবং সেটার পদ্ধতি জানার চেষ্টা করি।

ভিডিও যাচাই

ভিডিও অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও আমরা এএফপির সহায়তায় নির্মিত ইনভিড/উইভেরিফাই ক্রোম এক্সটেনশন ব্যবহার করি। এর কী-ফ্রেম ট্যাবের মাধ্যমে একটি ভিডিওকে বিভিন্ন থাম্বনেইলে ভাগ করা যায় যা দিয়ে পরবর্তীতে ছবির মতো রিভার্স ইমেজ সার্চ করা যায়।

আপনি যদি সন্দেহ করেন কোন ছবি বিকৃত করা হয়েছে বা উল্টে দেয়া হয়েছে সেক্ষেত্রেও এই এক্সটেনশনটি ছবিটিকে মূল রূপে ফিরিয়ে নিতে সাহায্য করবে। (ম্যাগনিফায়ার-এ যান> ছবি দিন>'মোর ফিল্টারস' এ ক্লিক করুন>'ফ্লিপে' ক্লিক করুন> 'অ্যাপ্লাই'তে ক্লিক করুন)।

তথ্য যাচাই

ইন্টারনেটে কোন ছবি বা তথ্য যদি সন্দেহজনক মনে হয় (বিশেষ করে সাথে যদি সূত্র উল্লেখ না থাকে) তখন প্রাথমিক কাজ হলো সংশ্লিষ্ট কমেন্ট/মন্তব্য দেখা। কেউ সেখানে বিপরীত তথ্য দিয়ে থাকতে পারেন, আবার কেউ পোস্টটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।

যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ থাকে সেক্ষেত্রে আমরা তাদের বক্তব্য জানার জন্য সরাসরি যোগাযোগ করি।

যদি কোন একটি ছবি বা ভিডিও এর উপর ভিত্তি করে কিছু প্রকাশ করা হয় তখন আমরা তুলনা করার জন্য একই ঘটনার অন্যান্য ছবি খোঁজার চেষ্টা করি। আমরা ছবির প্রকাশকের সাথেও যোগাযোগ করি, সম্ভব হলে অবস্থান নির্ণয় করে তা তুলে ধরার চেষ্টা করি।

যথাযথ সূত্রের সাথে যোগাযোগ

অনেক সময় আমাদেরকে এমন সব বিষয় নিয়ে যাচাই বাছাই করতে হয় যা সম্পর্কে আমাদের পূর্ব থেকে তেমন ধারণা থাকে না। এক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট বিষয়, স্থান অথবা ভাষায় পারদর্শী এএফপি‘র সাংবাদিকদের সহায়তা নেই। এএফপির বিশ্বব্যাপী যে ফ্যাক্ট চেকিং টিম আছে তাদের সাথে আমরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করি। 

কেবল ইন্টারনেটই একমাত্র সূত্র নয়

কিছু ফ্যাক্ট চেকের জন্য শুধু ইন্টারনেট আর টেলিফোন যথেষ্ট নয়। কখনো আমাদেরকে সরেজমিনেও কাজ করতে হয়।

২০১৮ সালের জুলাইতে একটি ভাইরাল ভিডিও যাচাই করার জন্য আমরা এএফপি‘র কুয়েতে কর্মরত সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করি। প্রাথমিকভাবে অনেক জায়গায় দাবি করা হয় যে, এটি একজন সৌদি নাগরিকের হাতে লন্ডনের একটি হাসপাতালের রিসেপশনিষ্টের লাঞ্চিত হওয়ার ভিডিও।

কিন্তু অনলাইনে প্রাথমিক যাচাইয়ে ভিন্ন তথ্য পাই আমরা। দেখা যায়, ভিডিওর ঘটনাটি মূলত ঘটেছে কুয়েত সিটির একটি পশু চিকিৎসালয়ে।

আমাদের স্থানীয় সাংবাদিক ক্লিনিকটিতে যান এবং নিশ্চিত হন যে সেই ক্লিনিকেই ঘটনাটি ঘটে। একইসাথে তিনি হামলার স্বীকার সেই কর্মীর বক্তব্যও নিয়ে আসেন। প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে

অনলাইনে প্রতিটি প্রতিবেদন প্রকাশের আগে একজন সিনিয়র সম্পাদক প্রতিবেদনটি নিরীক্ষা করেন।

ভুয়া তথ্য ছড়ানো রোধে এবং কোন পোস্ট পরবর্তীতে সংশোধন করা বা মুছে ফেলা হলে প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য আর্কাইভ করতে আমরা ওয়েব্যাক মেশিনপার্মা সিসির মতো টুলসগুলো ব্যবহার করে থাকি।

সংশোধন নীতি

আমরা যদি তথ্যগত কোন ভুল করে থাকি তবে তা সংশোধন করবো এবং মূল প্রতিবেদনে তা বিশেষভাবে উল্লেখ করবো। প্রতিবেদনটির নীচে স্পষ্টভাবে 'সংশোধনী' লিখে সেখানে সংশোধনের তারিখ ও ব্যাখ্যা উল্লেখ থাকবে। আমাদের ভুল যদি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয় তাহলে আমরা প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলবো এবং একটি ব্যাখ্যা দিবো। আমাদের পূর্বের সংশোধনীগুলোর একটি তালিকা দেখুন এখানে

কোন ব্যাখা অথবা হাল নাগাদ তথ্য জানানোর জন্য প্রতিবেদনটির নীচে 'সম্পাদনা' উল্লেখ থাকবে।

ক্লেইম রিভিউ টুল

এএফপি তার ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিবেদনগুলোর জন্য ক্লেইম রিভিউ টুল ‌ব্যবহার করে থাকে। এতে সাধারণত কী দাবি করা হয়েছে, কে দাবি করেছেন এবং আমাদের সিদ্ধান্ত উল্লেখ থাকে। এতে গুগল এবং বিং এর মতো সার্চ ইঞ্জিনের জন্য কোন নির্দিষ্ট দাবির বিপরীতে ফ্যাক্ট চেক তুলে ধরা সহজ হয়।

ফেসবুক এর সাথে সমন্বয়

এএফপি ফেসবুকের থার্ড পার্টি ফ্যাক্ট চেকিং কর্মসূচির একটি অংশীদার। আমাদের অনুসন্ধানের উপর ভিত্তি করে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট ফ্ল্যাগ করা হয়।

ফেসবুকের এই কর্মসূচীর মাধ্যমে এএফপির ফ্যাক্ট চেকিং কর্মসূচি সরাসরি সহায়তা পায়।

ফ্যাক্ট চেকাররা যে সকল কন্টেন্ট ফেসবুকে 'ফলস' হিসেবে চিহ্নিত করেন তা যাতে কম মানুষ দেখতে পারেন সেজন্য রিচ কমিয়ে দেওয়া হয়।

তবে এজন্য কোন কন্টেন্ট মুছে ফেলা হয় না।